ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর থেকেই নতুন ধরনের নেতৃত্বের বার্তা দিতে শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। “সবার আগে বাংলাদেশ” স্লোগান সামনে রেখে তিনি একের পর এক এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
ক্ষমতায় বসেই প্রটোকল কমানো, সরকারি গাড়ি পরিহার করা, এমনকি শনিবারেও অফিস খোলা রাখার মতো উদ্যোগকে অনেকেই দেখছেন এক নতুন ধারার সূচনা হিসেবে।
আমাদের দেশে সাধারণত প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীরা বিশাল গাড়িবহর নিয়ে চলাফেরা করেন। রাস্তা ফাঁকা করে দেওয়া হয়, দুই পাশে পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে, মানুষের চলাচলে অসুবিধা হয়।
কিন্তু এবার ভিন্ন ছবি দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজস্ব গাড়ি, নিজের চালক এবং নিজের কেনা জ্বালানি ব্যবহার করছেন। সরকারি সুবিধা গ্রহণ না করে ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় চলাচলের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি শক্ত বার্তা দেয়—ক্ষমতা মানেই বাড়তি বিলাসিতা নয়।
আগে প্রধানমন্ত্রীর বহরে ১৩ থেকে ১৪টি গাড়ি থাকত। এখন সেটি কমিয়ে মাত্র চারটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে যেমন খরচ কমবে, তেমনি অযথা ভিআইপি শোভাযাত্রার কারণে জনভোগান্তিও কমবে।
সড়কের দুই পাশে পুলিশের সারিবদ্ধ অবস্থান বাতিল করাও একই ভাবনার অংশ। ভাবুন তো, অফিসে যাওয়ার পথে হঠাৎ রাস্তা বন্ধ—এমন অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। সেই পরিস্থিতি কমাতে এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের স্বস্তি বাড়াবে।
প্রধানমন্ত্রী সাধারণ চলাচলের সময় গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেবল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেই পতাকা ব্যবহার করা হবে। এই পদক্ষেপটি প্রতীকী হলেও তা
গুরুত্বপূর্ণ। এটি বোঝায় যে, রাষ্ট্রের মর্যাদা বজায় থাকবে, তবে অহেতুক প্রদর্শন নয়—বরং প্রয়োজনেই প্রটোকল।
মন্ত্রিসভার বৈঠক সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এবার অধিকাংশ বৈঠক সচিবালয়ে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক হলে নিরাপত্তাজনিত কারণে আশপাশের সড়কে যানজট তৈরি হয়। সচিবালয়ে আয়োজন করলে সেই চাপ অনেকটাই কমবে।
এটা অনেকটা এমন—যেখানে ভিড় কম, সেখানে অনুষ্ঠান করলে সবার জন্যই সুবিধা হয়। প্রশাসনিক কাজেও ঠিক একই যুক্তি প্রযোজ্য।
প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে সপ্তাহে ছয় দিন অফিস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতি শনিবার তার কার্যালয় খোলা থাকবে। আমরা অনেকেই জানি, ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে যেতে সময় লেগে যায়। অতিরিক্ত একটি কর্মদিবস মানে কাজের অগ্রগতি দ্রুত হওয়া।
এটি শুধু প্রতীকী নয়, বাস্তব অর্থেও কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও জরুরি নীতিনির্ধারণে সময় বাঁচবে।
সরকার গঠনের পর সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠকে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সাধারণত এসব সুবিধা ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা গ্রহণ করেন। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত ধারার বাইরে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বড় বার্তা দেয়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বিলাসিতা নয়—বরং সাশ্রয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার।
ক্ষমতায় আসার পর অনেক সময় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ধীরগতির হয়ে পড়ে। কিন্তু এবার শুরুতেই ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং খাল খননের মতো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর খাল খনন প্রকল্প জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষি উৎপাদনে সহায়ক হবে।
এই উদ্যোগগুলো যদি দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকার পাবে।
সরকার ১৮০ দিনের একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
বিশেষ করে রমজান মাসে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং গণমাধ্যম কমিশন গঠনের বিষয়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রমজানে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সরকার আগেভাগেই পরিকল্পনা নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে ঘরোয়া জীবন—সব ক্ষেত্রেই স্থিতি বজায় থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং বিদ্যমান বাজার শক্তিশালী করা জরুরি।
একই সঙ্গে প্রশাসনে দুর্নীতির প্রভাবমুক্ত পরিবেশ গড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দৃশ্যমান উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের মধ্যে স্বচ্ছতা থাকে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই এসব সিদ্ধান্ত অনলাইন ও অফলাইনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে বলছেন, সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ; বাস্তবায়ন কঠিন। আবার অনেকেই আশাবাদী—যদি ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রটোকল কমানো থেকে শুরু করে বিশেষ সুবিধা বর্জন—এসব পদক্ষেপ একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত নীতিগুলো কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ ফলাফলই দেখতে চায়।
যদি এসব উদ্যোগ বাস্তবে রূপ পায়, তাহলে প্রশাসনে জবাবদিহিতা বাড়বে, খরচ কমবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হবে। আর সেটাই হবে সত্যিকারের নতুন শুরুর ভিত্তি।


