রাজধানী ঢাকার উত্তরায় আবারও এক হৃদয়বিদারক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার সকালে উত্তরার একটি আবাসিক সাত তলা ভবনে আগুন লেগে একই পরিবারের তিনজনসহ মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অনেকে। মুহূর্তের মধ্যেই স্বাভাবিক সকাল বদলে যায় আতঙ্ক, কান্না আর ধোঁয়ায় ভরা এক ভয়াল দৃশ্যে।
উত্তরার আবাসিক ভবনে আগুন লাগার ঘটনা
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকাল ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের একটি সাত তলা আবাসিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। সকালে মানুষ যখন কাজে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই হঠাৎ আগুনের লেলিহান শিখা পুরো ফ্ল্যাটে ছড়িয়ে পড়ে।
ভবনের ভেতরে থাকা মানুষজন প্রথমে বুঝতেই পারেননি আগুন কতটা ভয়ংকর রূপ নিতে যাচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধোঁয়ায় ভরে যায় পুরো তলা। অনেকেই বের হওয়ার সুযোগ পাননি।
একই পরিবারের তিনজনসহ নিহত ছয়জন
ফায়ার সার্ভিসের জনসংযোগ কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, আগুন লাগার পরপরই তিনজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ১৩ জনকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্রে পরে আরও তিনজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
উত্তরা বিভাগের পুলিশের উপ-কমিশনার শাহরিয়ার আলী জানান, নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের তিনজন রয়েছেন। তবে দুর্ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি অস্থির থাকায় নিহতদের নাম ও পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ বিষয়টি যাচাই করছে।
কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল আগুন
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ভবনের ঘরে বিপুল পরিমাণ আসবাবপত্র ও দাহ্য সামগ্রী থাকায় আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় তলায় লাগা আগুন অল্প সময়ের মধ্যেই তৃতীয় তলা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
ঢাকা জোন–৩ এর উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল মান্নান জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযান
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সকাল ৮টা ২৫ মিনিটের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও পুরোপুরি আগুন নেভাতে সময় লাগে প্রায় ১০টা পর্যন্ত।
উদ্ধারকর্মীরা ধোঁয়ার মধ্যে ঢুকে আটকে পড়া মানুষদের বের করে আনার চেষ্টা করেন। অনেককে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এই সময় আশপাশের এলাকাজুড়ে চরম উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
এলাকাবাসীর আতঙ্ক ও শোকের পরিবেশ
ঘটনার পর উত্তরার ওই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকালে এমন ভয়াবহ ঘটনা তারা কখনও কল্পনাও করেননি। অনেকেই নিজের পরিবারের কথা ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, সকালে হঠাৎ চিৎকার শুনে বাইরে বের হয়ে দেখি পুরো ভবন ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। মানুষ জানালা দিয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল। সেই দৃশ্য আজও চোখে ভাসছে।
রাজধানীতে অগ্নিকাণ্ড: পুরোনো আতঙ্ক নতুন করে
ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন কিছু নয়। প্রায়ই আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে আগুন লাগার খবর আসে। কিন্তু প্রতিবারই এমন ঘটনায় প্রাণহানি হলে প্রশ্ন উঠে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, পুরোনো বৈদ্যুতিক তার, অতিরিক্ত লোড এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।
অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি
অনেক আবাসিক ভবনে এখনও পর্যাপ্ত ফায়ার এক্সিট, অ্যালার্ম সিস্টেম বা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নেই। থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করার প্রশিক্ষণ বাসিন্দাদের নেই।
এই ঘটনায়ও যদি ভবনে আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো প্রাণহানি কমানো সম্ভব হতো বলে মনে করছেন অনেকে।
তদন্ত চলছে, অপেক্ষা প্রশ্নের উত্তর
ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ যৌথভাবে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। আগুনের প্রকৃত কারণ কী, ভবনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কিনা, বৈদ্যুতিক সংযোগে কোনো ত্রুটি ছিল কিনা—সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।


