বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু ঘিরে। তার নিখোঁজ হওয়া, সর্বশেষ লেখা প্রকাশ এবং পরে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশের সাংবাদিক সমাজে গভীর বেদনা, ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনা শুধু একজন সাংবাদিকের মৃত্যু নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সংকট, সাংবাদিকদের বেতন বৈষম্য, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এ খবর বিবিসি বাংলা অনলাইনের।
২১ আগস্ট সকালে অফিস যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন দৈনিক আজকের পত্রিকা-র সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার। এরপর তিনি নিখোঁজ হন। একই দিন সকালে তিনি একটি ইমেইল পাঠান স্থানীয় গণমাধ্যমে, যেখানে নিজের লেখা পাঠিয়ে ফুটনোটে উল্লেখ করেন—
“জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন।” পরদিন মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম পরবর্তীতে তার সেই লেখাটি প্রকাশ করে, যা দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলে।
তার শেষ লেখায় উঠে এসেছে দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, বঞ্চনা ও হতাশা। তিনি উল্লেখ করেছেন, “পাঁচ দশকের বেশি সময় সাংবাদিকতা করেও সম্মানজনক বেতন পাইনি।”
বেতন বৈষম্য নিয়েও তার ক্ষোভ ছিল স্পষ্ট— “আমার বিভাগীয় প্রধানের বেতন আমার প্রায় দ্বিগুণ। আহা, যদি ওই বেতনের চাকরি পেতাম, হয়তো ধার-দেনার বোঝা বইতে হতো না।”
তিনি লিখেছেন, সংবাদপত্রে অনিয়ম ও চাপের কথা। এমনকি রাজনৈতিক প্রভাব, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকোচন নিয়েও তার অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে।
বিভুরঞ্জনের মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; বরং বাংলাদেশের সাংবাদিকদের পেশাগত বাস্তবতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশে অনেক সাংবাদিক মাসের পর মাস বেতন পান না। ওয়েজবোর্ড থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল নিয়ম মেনে বেতন দেয় না।
নওয়াজ ফারহিন অন্তরা, এক দৈনিকের সাংবাদিক, লিখেছেন: “সাংবাদিকরা বেতন পান না। বেতন পান না, সেটাও লিখতে পারেন না।”
এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের একজন সাংবাদিকের ভাষ্য: “চার বছর আগে ১৭ হাজার বেতনে শুরু করেছিলাম, এখন ২৭ হাজার। অথচ অন্য সেক্টরে সমমানের পেশাদাররা দ্বিগুণ আয় করছে।”
টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজবোর্ড নেই। ফলে শ্রম আইন অনুযায়ী মামলা করলেও সমাধান পেতে বছর লেগে যায়।
বাংলাদেশের সাংবাদিকরা দীর্ঘদিন ধরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকটে রয়েছেন। বিভুরঞ্জন তার শেষ লেখায় লিখেছেন:
“সরকার পরিবর্তনের পরও গণমাধ্যমের অবস্থা কাহিল হয়েছে। নির্বাহীরা সবসময় আতঙ্কে থাকেন—কোন খবর বা লেখার জন্য কখন ফোন আসবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, “ভয়ের উৎস বদলেছে, কিন্তু সাংবাদিকদের স্বাধীনতা বাড়েনি। এখন সেলফ-সেন্সরশিপ আগের চেয়ে আরও বেশি।”
সিনিয়র সাংবাদিক তৌহিদুর রহমান মনে করেন, বিভুরঞ্জনের মৃত্যু রাজনৈতিক অবক্ষয়ের সরাসরি প্রতিফলন। তার ভাষায়:
“দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক শক্তিগুলো সবসময় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোও সেই সুযোগে একের পর এক মিডিয়া হাউজ কব্জা করেছে।”
ফলে, স্বাধীন সাংবাদিকতার বদলে ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছে। পেশাদার সাংবাদিকদেরও বাধ্য হয়ে এই নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর ভেতরে কাজ করতে হচ্ছে।
প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ মনে করেন, বিভুরঞ্জনের মৃত্যু বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। তার মতে:
“এই মৃত্যু দেখিয়েছে আমরা কীরকম এক শূন্যতার মাঝে আছি।” তিনি বলেন, পেশাদার সাংবাদিকতার কাঠামো না থাকায় গণমাধ্যমের আর্থিক স্বনির্ভরতা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন তিনটি মৌলিক পরিবর্তন: ওয়েজবোর্ড সঠিকভাবে বাস্তবায়ন, সময়মতো বেতন ও ভাতা প্রদান, চাকরির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সাংবাদিকতা, সেন্সরশিপ ও আত্ম-সেন্সরশিপের অবসান, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা।
তৌহিদুর রহমানের মতে, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা ও সহযোগিতামূলক কাজের সুযোগ তৈরি হলে গণমাধ্যমের উপর প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমানো সম্ভব।
বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা ও সীমাবদ্ধতাকে নতুন করে উন্মোচন করেছে। বেতন বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রভাব, সেন্সরশিপ ও অনিশ্চিত কর্মপরিবেশের কারণে সাংবাদিকরা প্রতিদিন লড়াই করছেন। সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে সংকট আরও গভীর হবে।
সাংবাদিকদের জন্য শুধু সহমর্মিতা নয়, এখন প্রয়োজন সংগঠিত পদক্ষেপ, পেশাদারি কাঠামো এবং স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার।


