আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্বাচনকালীন সময়ে অর্থের অপব্যবহার, ভোট কেনাবেচা এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেন ঠেকাতে মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবায় সাময়িক সীমাবদ্ধতা আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ সব মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন লেনদেনের নিয়মে বড় পরিবর্তন আসছে।
এই সিদ্ধান্ত সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক কর্মী এবং ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রভাবিত করবে। তাই নতুন নিয়মগুলো কী, কেন এই সিদ্ধান্ত, কতদিন কার্যকর থাকবে এবং গ্রাহকদের কী জানা দরকার—সবকিছু বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কেন লেনদেন সীমিত করা হচ্ছে
নির্বাচনের সময় অর্থের অবৈধ ব্যবহার একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অতীতে দেখা গেছে, ভোটার প্রভাবিত করতে নগদ অর্থ ও ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে টাকা ছড়ানো হয়। এসব ঝুঁকি কমাতেই নির্বাচন কমিশনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আর্থিক লেনদেন সীমিত করার প্রস্তাব দেয়।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। লক্ষ্য একটাই—নির্বাচনকালীন সময়ে যেন কোনোভাবেই বড় অঙ্কের অর্থ দ্রুত হাতবদল না হয় এবং সন্দেহজনক লেনদেন সহজে শনাক্ত করা যায়।
বিকাশ, নগদ ও রকেটে নতুন লেনদেন সীমা
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্বাচনকালীন সময়ে এমএফএস সেবায় লেনদেনের সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হচ্ছে। একজন গ্রাহক দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অন্য গ্রাহকের কাছে পাঠাতে পারবেন। তবে প্রতিটি লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা।
এর মানে দাঁড়াচ্ছে, একদিনে বড় অঙ্কের টাকা একবারে পাঠানো যাবে না। সর্বোচ্চ ১০টি লেনদেন করা যাবে এবং প্রতিবার এক হাজার টাকার বেশি পাঠানো নিষিদ্ধ থাকবে। এই নিয়ম বিকাশ, নগদ, রকেটসহ সব মোবাইল ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
কতদিন এই নিয়ম কার্যকর থাকবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এই সীমাবদ্ধতা ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ পুরো নির্বাচনকালীন সময়জুড়ে এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হবে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে সীমার অঙ্কে সামান্য পরিবর্তন আনা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
বর্তমানে এমএফএসে লেনদেনের নিয়ম কী ছিল
নির্বাচনের আগে এমএফএস গ্রাহকেরা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করতেন। একজন গ্রাহক দিনে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং মাসে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করতে পারতেন। একবারে বড় অঙ্কের টাকা পাঠানোও সম্ভব ছিল।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিত হচ্ছে। ফলে হঠাৎ করেই এমএফএস ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন আসবে।
ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও ব্যাংক অ্যাপে বড় সিদ্ধান্ত
শুধু মোবাইল ব্যাংকিং নয়, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও ব্যাংক অ্যাপ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। বর্তমানে একজন ব্যক্তি গ্রাহক ব্যাংকের অ্যাপ বা ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করে দিনে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অন্য ব্যক্তির কাছে স্থানান্তর করতে পারেন।
নির্বাচনকালীন সময়ে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি টাকা স্থানান্তর সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
নগদ টাকা জমা ও উত্তোলনে নজরদারি আরও কঠোর
ডিজিটাল লেনদেনের পাশাপাশি নগদ টাকার চলাচলও কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো হিসাবে এক দিনে এক বা একাধিক লেনদেনের মাধ্যমে যদি ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ জমা বা উত্তোলন হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অবশ্যই বিএফআইইউতে নগদ লেনদেনের প্রতিবেদন বা সিটিআর জমা দিতে হবে।
এই প্রতিবেদন আপাতত সাপ্তাহিক ভিত্তিতে জমা দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই নিয়ম বহাল থাকবে।
সিটিআরে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে কী হবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিটিআর বিশ্লেষণের সময় যদি কোনো অস্বাভাবিক লেনদেন বা সন্দেহজনক তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
যদি কোনো ব্যাংক এই বিষয়ে গাফিলতি করে বা নিয়ম মানতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের বিধান অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে জরিমানা থেকে শুরু করে অন্যান্য আইনগত পদক্ষেপও থাকতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের চাহিদার ভিত্তিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখতে অর্থ লেনদেন সীমিত করার বিষয়ে কাজ চলছে এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব দ্রুতই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা আসবে।
সাধারণ গ্রাহকদের কী জানা দরকার
এই সময়ে সাধারণ গ্রাহকদের সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো পরিকল্পনা করে লেনদেন করা। বড় অঙ্কের টাকা পাঠানোর প্রয়োজন থাকলে আগেভাগেই ব্যবস্থা নেওয়া ভালো। দৈনন্দিন প্রয়োজনের বাইরে অপ্রয়োজনীয় লেনদেন এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি। যারা এমএফএসের মাধ্যমে নিয়মিত বড় অঙ্কের লেনদেন করেন, তাদের বিকল্প পদ্ধতি বা সময় সমন্বয় করে কাজ করতে হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে সিদ্ধান্তটির গুরুত্ব
নির্বাচনকালীন সময়ে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। বিকাশ, নগদ, রকেটসহ সব ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় এই সাময়িক সীমাবদ্ধতা হয়তো অনেকের জন্য কিছুটা অসুবিধার কারণ হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আর্থিক লেনদেনে যে নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে, তা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোরই একটি অংশ। এখন দেখার বিষয়, বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ কতটা সফল হয়।



