নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কাজের গতি বাড়াতে সরাসরি মাঠে নেমেছেন। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো তিনি বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেন। সকাল ৯টার কিছু পরই তিনি বাংলাদেশ সচিবালয়–এর মন্ত্রিপরিষদ ভবনে অবস্থিত অস্থায়ী কার্যালয়ে পৌঁছান। নতুন প্রধানমন্ত্রীর এই সক্রিয় উপস্থিতি ইতিমধ্যেই প্রশাসনে নতুন উদ্যম তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের প্রথম দিকের অগ্রাধিকার হিসেবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আর সেই লক্ষ্যেই আজকের কর্মসূচিতে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক।
সরকারি সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রীর স্থায়ী কার্যালয় ও সরকারি বাসভবন যমুনা বর্তমানে সংস্কার ও মেরামতের কাজের মধ্যে রয়েছে। তাই কয়েক দিন তিনি সচিবালয় থেকেই নিয়মিত অফিস পরিচালনা করবেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনে গতিশীলতা আনার দিকে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন তিনি। সকাল থেকেই একের পর এক নথি পর্যালোচনা, দিকনির্দেশনা এবং বৈঠকের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সরকারের ভেতরের লোকজন বলছেন, এই গতি বজায় থাকলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় অনেক কমে আসবে।
আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হলো ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা। বেলা সাড়ে ১১টায় এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য খুব সহজ ভাষায় বললে—যাদের আয় কম, তাদের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কম দামে পৌঁছে দেওয়া। যেমন ধরুন, বাজারে চাল-ডাল বা তেল হঠাৎ দাম বেড়ে গেল। তখন ফ্যামিলি কার্ড থাকলে নির্ধারিত দামে এসব পণ্য পাওয়া যাবে। এতে পরিবারগুলোর মাসিক খরচ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সরকার একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যাতে শুধু অস্থায়ী সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ উপকার পায়। তাই তালিকা প্রণয়ন, যাচাই এবং বিতরণ ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার বিষয়েও আলোচনা হবে।
উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবরা উপস্থিত থাকবেন। তারা ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পুরো প্রক্রিয়ার কারিগরি দিক প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরবেন।
বিশেষ করে যেসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে, কারা এই কার্ড পাবে- কীভাবে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করা হবে, কোথা থেকে পণ্য বিতরণ হবে, কীভাবে অপব্যবহার বন্ধ করা যাবে
সরকার চায়, আগের কিছু প্রকল্পের মতো যেন ভুয়া তালিকা বা অনিয়ম না হয়। তাই শুরু থেকেই শক্ত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নতুন সরকার। ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগকে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কর্মসূচি সফলভাবে চালু করতে পারলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও কমবে। বিশেষ করে শহরের দিনমজুর, গ্রামাঞ্চলের ছোট কৃষক এবং অনিয়মিত আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারে।
শুধু সামাজিক সুরক্ষা নয়, পরিবেশ নিয়েও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। বিকেল ২টায় তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার নিয়ে আরেকটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় যোগ দেবেন।
এই বৈঠকে আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি নদ-নদী ও খাল খনন, জলাধার পুনরুদ্ধার এবং দখলমুক্ত করার বিষয়গুলোও এজেন্ডায় রয়েছে।
সহজ করে বললে, সরকার একদিকে মানুষের পকেটের চাপ কমাতে চায়, অন্যদিকে প্রকৃতির ভারসাম্যও ঠিক রাখতে চায়।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। তাই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এখন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়, অর্থনীতি ও জীবিকার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।
সরকারপ্রধান ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দখল হওয়া খাল ও নদী উদ্ধারে কঠোর হতে ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানা গেছে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের অভিযানও দেখা যেতে পারে সামনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি খাল–নদী পুনরুদ্ধার সত্যিই কার্যকরভাবে করা যায়, তাহলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমার পাশাপাশি কৃষিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রশাসনের ভেতরের অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত সচিবালয় উপস্থিতি একটি শক্ত বার্তা দিচ্ছে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হচ্ছে এবং ফাইল জট কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অনেকে বিষয়টা এভাবে ব্যাখ্যা করছেন—যেমন কোনো অফিসে বস নিজে প্রতিদিন ঘুরে দেখলে কর্মীদের কাজের গতি বাড়ে, ঠিক তেমনি প্রশাসনেও একই প্রভাব পড়ছে।
সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই ধারাবাহিক বৈঠকগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধরা হচ্ছে।
যদি ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাজারের অস্থিরতার সময় নিম্নআয়ের মানুষ বড় ধরনের সুরক্ষা পাবে। একই সঙ্গে বৃক্ষরোপণ ও জলাধার পুনরুদ্ধার কর্মসূচি সফল হলে পরিবেশগত ঝুঁকিও কমতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, সামাজিক সুরক্ষা ও পরিবেশ—এই দুই খাতে একসঙ্গে জোর দিলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।



