বাংলাদেশে মাত্র ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে দু’দফা ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে খুলনা ও সাতক্ষীরা সংলগ্ন এলাকায় উৎপত্তি হওয়া কম্পনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে কলকাতা-সহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ধারাবাহিক কম্পন ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের জন্য সতর্ক সংকেত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, যা কিছুটা স্বস্তির খবর।
খুলনা–সাতক্ষীরা অঞ্চলে ভূমিকম্পের উৎপত্তি
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার কাছাকাছি এলাকা। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৫, যা মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হিসেবে ধরা হয়। ভূকম্পন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাত্রার ভূমিকম্পে সাধারণত বড় ধ্বংসযজ্ঞ না হলেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ২৮০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ছিল মূল উৎপত্তিস্থল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কম্পনের প্রভাব সহজেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে যায়।
১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে দু’বার কম্পন
এ ঘটনা আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে কারণ মাত্র ১৩ ঘণ্টার মধ্যে দু’বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর আগেও বুধবার ও বৃহস্পতিবার একই অঞ্চলে মৃদু কম্পন ধরা পড়েছিল। ফলে একের পর এক ভূমিকম্পে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট কম্পন অনেক সময় বড় ভূমিকম্পের আগাম ইঙ্গিতও হতে পারে, যদিও সব ক্ষেত্রে তা সত্যি হয় না। তাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।
কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় কম্পন অনুভূত
শুক্রবার দুপুর ১টা ২২ মিনিট নাগাদ হঠাৎ করে কলকাতা ও সংলগ্ন দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক এলাকায় কম্পন টের পান মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রায় ৫০ সেকেন্ডেরও বেশি সময় ধরে ভবন ও আসবাবপত্র দুলতে থাকে।
অনেকেই তখন বাড়ি বা অফিসে ছিলেন। কেউ কেউ হালকা দুলুনি অনুভব করে প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারেননি। পরে সামাজিক মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়তেই নিশ্চিত হন যে এটি ভূমিকম্প।
উত্তর-পূর্ব ভারতেও প্রভাব
বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় কম্পনের প্রভাব ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। অসম ও মিজোরামের বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দারা দুলুনি টের পান বলে জানা গেছে। ভূকম্পবিদরা বলছেন, ভূমিকম্পের তরঙ্গ মাটির গঠন অনুযায়ী অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে যখন কেন্দ্রস্থল অগভীর হয়।
জুম্মার নামাজের পর আতঙ্ক
ঘটনার সময় ছিল শুক্রবার দুপুর। দেশের বিভিন্ন স্থানে জুম্মার নামাজ শেষ করে মানুষ যখন বাড়ি ফিরছিলেন, ঠিক তখনই আচমকা শুরু হয় প্রবল দুলুনি। পথঘাট, ঘরবাড়ি—সবকিছু যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেঁপে ওঠে।
প্রথম ধাক্কায় অনেকেই বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তবে কয়েক মুহূর্ত পর পরিস্থিতি পরিষ্কার হলে মানুষ দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অনেককে খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে।
ক্ষয়ক্ষতির খবর কী?
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এই ভূমিকম্পে বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি বা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে এবং জরুরি সেবাগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলেও দুর্বল ভবন বা অপরিকল্পিত নির্মাণে ঝুঁকি থাকে। তাই নাগরিকদের সব সময় সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কেন বারবার ভূমিকম্প হচ্ছে?
বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের ভূগোল এমন যে এই অঞ্চলটি কয়েকটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত। বিশেষ করে ভারতীয় প্লেট ও বার্মা প্লেটের পারস্পরিক চাপের কারণে মাঝেমধ্যে কম্পন তৈরি হয়।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ভূমিকম্প পুরোপুরি পূর্বাভাস দেওয়া এখনও সম্ভব নয়। তবে ধারাবাহিক কম্পন হলে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি, যাতে বড় কোনো ঝুঁকির আগাম প্রস্তুতি নেওয়া যায়।
ভূমিকম্প হলে কী করবেন?
ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত না হয়ে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। যেমন—
- ঘরের ভেতরে থাকলে শক্ত টেবিল বা আসবাবের নিচে আশ্রয় নিন
- জানালা ও ভারী আলমারি থেকে দূরে থাকুন
- লিফট ব্যবহার করবেন না
- বাইরে থাকলে খোলা জায়গায় সরে যান
এই ছোট ছোট সতর্কতাই জীবন বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
শেষ কথা
১৩ ঘণ্টায় দু’বার ভূমিকম্পের ঘটনা দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও এখন পর্যন্ত বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবুও এমন ধারাবাহিক কম্পনকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সচেতনতা, নিরাপদ নির্মাণ এবং দ্রুত তথ্যপ্রবাহ—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ভূমিকম্পপ্রবণ এই অঞ্চলে সতর্ক থাকা ছাড়া বিকল্প নেই।



