নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন, আশা আর শঙ্কা কাজ করে। ভোট দিতে পারব তো নির্বিঘ্নে? এলাকায় কোনো অশান্তি হবে না তো? এই ভাবনাগুলো খুব স্বাভাবিক। ঠিক এমন বাস্তবতা মাথায় রেখেই নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলায় অনুষ্ঠিত হলো এক গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভা। এখানে অবাধ নির্বাচন, সামাজিক অপরাধ রোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং জনবান্ধব পুলিশিং নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আল মামুন শিকদার।
এই আয়োজন শুধু একটি সভা ছিল না। এটি ছিল পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস গড়ে তোলার এক বাস্তব উদ্যোগ।
গত ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে লোহাগড়া থানা পুলিশের উদ্যোগে লাহুড়িয়া এলাকায় এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সভাটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নড়াইল জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আল মামুন শিকদার। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, থানা পুলিশের দায়িত্বশীল সদস্যরা এবং তদন্ত কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ সভায় অংশ নেন। এতে বোঝা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সবাই একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আল মামুন শিকদার বলেন, চলতি বছরে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ভোট দেওয়ার অধিকার জনগণের হাতে। কাকে নির্বাচিত করবেন, সে সিদ্ধান্তও জনগণই নেবে। পুলিশ প্রশাসন এখানে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পুলিশ কোনো পক্ষের নয়। পুলিশের কাজ হলো নির্বাচনকে নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও ভয়মুক্ত রাখা। যাতে প্রতিটি ভোটার নিশ্চিন্তে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আল মামুন শিকদার সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভোট না দিলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। নিজের ভোট নিজে না দিলে অন্য কেউ আপনার হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় শালীনতা বজায় রাখা খুব জরুরি। কাদা ছোড়াছুড়ি বা বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং ভালো আচরণ আর ইতিবাচক কাজ দিয়েই মানুষের মন জয় করা উচিত।
বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে সমাজে শান্তি দরকার। আর শান্তির মূল ভিত্তি হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। পুলিশ সুপার তাঁর বক্তব্যে এই বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ধর্ম, বর্ণ বা মতের পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই পার্থক্যকে ঘিরে যদি বিদ্বেষ তৈরি হয়, তাহলে উন্নয়ন থেমে যায়। সমাজে শান্তি থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদ ও সুন্দর জীবন পায়।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আল মামুন শিকদার জোর দিয়ে বলেন, আইনশৃঙ্খলা শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়। পুলিশ একা সব করতে পারে না। জনগণের সহযোগিতা ছাড়া সমাজ নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, কোথাও অপরাধ দেখলে বা সন্দেহজনক কিছু মনে হলে পুলিশকে জানাতে হবে। ভয় বা দ্বিধা না করে সামনে আসতে হবে। জনগণ সচেতন হলে অপরাধীরা সাহস পায় না।
অনেক মানুষ এখনো থানায় যেতে ভয় পান। কেউ কেউ মনে করেন, থানায় গেলে হয়রানি হতে পারে। এই ভুল ধারণা ভাঙতেই এমন মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
তিনি বলেন, পুলিশ জনগণের বন্ধু। কোনো দালাল বা মধ্যস্থতা ছাড়াই থানায় এসে সেবা নিতে পারবেন। মিথ্যা তথ্য দিয়ে পুলিশকে হয়রানি না করারও আহ্বান জানান তিনি।
সভায় মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাইবার ক্রাইম নিয়ে কঠোর বার্তা দেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে।
যারা মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা অনলাইন অপরাধে জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে কোনো ছাড় নেই।
বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, নারী নির্যাতন, মানব পাচার ও কিশোর অপরাধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, এসব অপরাধ শুধু ভুক্তভোগীর ক্ষতি করে না, পুরো সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
পরিবার থেকেই সচেতনতা শুরু করতে হবে। বাবা-মা, শিক্ষক, সমাজের দায়িত্বশীল মানুষ সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
সভায় উপস্থিত সবার প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয় কিছু সামাজিক ব্যাধি থেকে দূরে থাকার জন্য। এর মধ্যে রয়েছে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, গ্রাম্য কাইজ্যা, দলীয় গ্রুপিং, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, মাদক সেবন ও ব্যবসা, জুয়া, ইভটিজিং, নারী নির্যাতন, বহুবিবাহ, কিশোর গ্যাং, দলবদ্ধভাবে আইন লঙ্ঘন এবং বাল্যবিবাহ।
পুলিশ সুপার বলেন, এসব কাজ শুধু আইনগত অপরাধ নয়। এগুলো সমাজের শিকড় নষ্ট করে দেয়।
এই মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মোহাম্মদ রকিবুল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, লোহাগড়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আব্দুর রহমান, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) অজিত কুমার রায় এবং লাহুড়িয়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ উত্তম কুমার বিশ্বাস।
সভা শেষে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, পুলিশের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেয়ে তাঁদের ভরসা বেড়েছে। আগে অনেক বিষয় পরিষ্কার ছিল না। আজ পুলিশের বক্তব্য শুনে অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন তাঁরা।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমরা যদি নিজেরাই সচেতন হই, তাহলে সমাজ অনেক ভালো থাকবে। পুলিশ একা নয়, আমাদের সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।
সব মিলিয়ে লোহাগড়ায় অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভা ছিল সময়োপযোগী ও কার্যকর একটি উদ্যোগ। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সভা নয়। এটি ছিল পুলিশ ও জনগণের মাঝে আস্থার সেতুবন্ধন।
এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত হলে অপরাধ কমবে, ভোটের পরিবেশ নিরাপদ হবে এবং নড়াইলসহ পুরো অঞ্চলে শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে।


