এনসিপির পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, মামলা বাড়ছেই
গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর জুলাই মাসের পদযাত্রা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের ঘটনায় মোট ১০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ৩৩৪ জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সাম্প্রতিক দুটি মামলা করা হয়েছে টুঙ্গিপাড়া থানা এবং সদর থানায়। নতুন মামলাগুলোর মাধ্যমে ২৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১,২০০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অভিযোগপত্রে সরকারি কাজে বাধা, সহিংসতা, জেল হামলা এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে।
অভিযান অব্যাহত, গ্রেফতার আতঙ্কে পুরুষশূন্য এলাকা
পুলিশ জানায়, ১৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই ঘটনার পর থেকে গোপালগঞ্জের সদর, কাশিয়ানী, টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া ও মুকসুদপুরে ধারাবাহিক অভিযান চলছে। এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে:
- সদর থানা: ১১২ জন
- কাশিয়ানী: ৭৭ জন
- মুকসুদপুর: ৮৮ জন
- টুঙ্গিপাড়া: ২৯ জন
- কোটালীপাড়া: ২৮ জন
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১১ জন গ্রেফতার হয়েছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে গভীর আতঙ্ক। দোকানপাট ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান খোলা থাকলেও, মানুষের চলাচল নেই বললেই চলে। শহরের বেশিরভাগ এলাকায় পুরুষশূন্য অবস্থা বিরাজ করছে।
নিরীহদের হয়রানির অভিযোগ
অনেকেই অভিযোগ করছেন, অভিযানে নিরীহ লোকজনকেও গ্রেফতার করা হচ্ছে।
একজন বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি আদালতে পারিবারিক মামলায় হাজিরা দিতে গিয়েছিলাম, পরে জানতে পারি আমাকে একটি মামলায় ২১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।”
নজরুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, “আমার ১৭ বছরের ছেলেকে খেলার মাঠ থেকে ফেরার পথে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এখন সে বড় অপরাধীদের সঙ্গে জেলে রয়েছে।”
মুন্নি বেগম, একজন বিধবা মা বলেন, “ছেলে ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালায়। তাকে গ্রেফতার করেছে। আমি থানার গেটে দাঁড়িয়ে আছি, এক ফোঁটা খাবারও দিতে পারছি না।”
বিএনপির গণগ্রেফতার বন্ধের আহ্বান
গোপালগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শরীফ রফিকুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “নিরীহ সাধারণ মানুষকে এভাবে গ্রেফতার করে হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে।” তিনি প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান, যেন সঠিক তদন্ত ছাড়া কাউকে আটক করা না হয়।
নিহতদের লাশ উত্তোলন ও ময়নাতদন্ত
এ ঘটনায় পাঁচ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করা হয়েছে।
নিহতদের তালিকা:
- রমজান মুন্সী (৩৫) – থানাপাড়া, গোপালগঞ্জ
- দীপ্ত সাহা (২৫) – উদয়ন রোড
- ইমন তালুকদার (১৭) – ব্যাপারীপাড়া
- সোহেল রানা (৩৫) – টুঙ্গিপাড়া
- রমজান কাজী (১৮) – বিসিক এলাকা
দীপ্ত সাহার লাশ দাহ করায় ময়নাতদন্ত সম্ভব হয়নি। রমজান মুন্সী মারা যান ঢাকায়, সেখানেই ময়নাতদন্ত হয়।
স্বজনদের কান্নায় ভারী গোপালগঞ্জ
নিহত রমজান কাজীর মামা রাসেল কাজী বলেন, “ভাগনের শরীরে গুলির চিহ্ন ছিল। পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। আমরা বিচার চাই।”
ইমনের মামাতো ভাই মো. রানা বলেন, “ইমন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিল, কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল না। এখন পরিবারের খাবার পর্যন্ত নেই। মামলার সাহসও পাচ্ছি না, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
ইমনের বাবা বলেন, “আমার ছেলেকে কাঁধে নিয়ে দাফন করেছি। বিচার চাই—কিন্তু জানি না পাবো কি না।”
১৪৪ ধারা থেকে কারফিউ পর্যন্ত, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনী
১৬ জুলাই সংঘর্ষের পর প্রথমে ১৪৪ ধারা এবং পরে কারফিউ জারি করা হয়। কয়েক ধাপে কারফিউ বাড়ানো হয় এবং অবশেষে ২১ জুলাই রাত থেকে কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়।
বর্তমানে যৌথ বাহিনী, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সদস্যরা মাঠে রয়েছে। প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
জনমনে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা
গোপালগঞ্জে এনসিপি-পদযাত্রা নিয়ে যে সহিংসতার সূত্রপাত, তা এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়, আর সাধারণ মানুষ আছেন আতঙ্কে।
নিরীহ নাগরিকদের হয়রানি বন্ধ করে সত্যিকার অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনাই হতে পারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার একমাত্র পথ।


