মাটি ও মানুষের শিল্পী, ভাবুক চিত্রস্রষ্টা সমীর মজুমদার বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে এক অনন্য নাম। ১৯৬৯ সালের ৬ মার্চ নড়াইল জেলার সদর উপজেলার পংকবিলা ইউনিয়নের আউড়িয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। বাংলার লাল মাটির ভেতর থেকে উঠে আসা এই শিল্পী শৈশব থেকেই কৃষক-শ্রমিক মানুষের জীবনসংগ্রাম প্রত্যক্ষ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁর ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে শক্তিশালী সামাজিক ভাষ্যে।
বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান-এর আদর্শে গভীরভাবে প্রভাবিত সমীর মজুমদারের শিল্পদর্শন ছিল স্পষ্ট—শিল্প কখনো নিরপেক্ষ নয়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শিল্প হয় শোষকের হাতিয়ার, নয়তো শোষিত মানুষের অস্ত্র। তাঁর শিল্পে গ্রামীণ জীবন নিছক নান্দনিক বিষয় নয়; সেখানে জমির প্রশ্ন আছে, উৎপাদনের প্রশ্ন আছে, মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম আছে।
১৯৯৭ ও ২০১৪ সালে এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল বাংলাদেশে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পমঞ্চে নিজের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৯৩ সালে নড়াইল সরকারি বালক বিদ্যালয়ে এবং ২০১৩ সালে রূপগঞ্জ নড়াইল জেলা প্রেসক্লাবের আয়োজনে এস এম সুলতান ও সোভিয়েত রাশিয়ার শিল্পীদের সঙ্গে যৌথ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ ছিল তাঁর শিল্পজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৯৬ সালে সুলতান মেলার প্রাক্-উদ্বোধনী একক প্রদর্শনী এবং ২০০১ সালে নড়াইল জেলা পাবলিক লাইব্রেরিতে একক প্রদর্শনী আয়োজন করে তিনি সম্মাননা সনদ লাভ করেন।
জাতীয় পর্যায়েও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৪ সালে খুলনার গিলেতলা সেনানিবাসে প্রধানমন্ত্রীকে শিল্পকর্ম প্রদর্শনের সুযোগ লাভ করেন। ২০০০ সালে ঢাকা সেনানিবাসের বিজয় কেতন জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাঠের ভাস্কর্য ‘বিজয়’ প্রদর্শিত হয় এবং স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী কর্তৃক ৩ টি চিত্রকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে।তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনীসহ ১৬তম, ২২তম, ২৩তম ও ২৪তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ২০১৮ সালে ভারতের শিমলায় আন্তর্জাতিক চারুকলা প্রদর্শনীতেও তাঁর শিল্পকর্ম স্থান পায়।
২০১৩ সালে ঢাকার বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে যৌথ প্রদর্শনী, ২০২১ সালের “Art Against Corona” প্রদর্শনী এবং ২০১৫ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-তে শিল্পকর্ম প্রদর্শন তাঁর সমসাময়িক শিল্পচর্চার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উল্লেখযোগ্য যে, একই প্রতিষ্ঠানে তাঁর তিনটি চিত্রকর্ম সরকারি ভাবে সংরক্ষিত আছে—যা তাঁর শিল্পভাবনার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বহন করে।
১৯৯৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিয়মিতভাবে সুলতান মেলায় অংশ নিয়ে তিনি এস এম সুলতান-এর স্মৃতি ও আদর্শ ধারণ ও লালন করেছেন। ২০১০ সালে সুলতানের নামের অবমাননার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সুলতানের শিল্পদর্শন নিয়ে গবেষণা এবং নিজস্ব শিল্পধারণা নির্মাণে মনোনিবেশ করেন।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। ২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যশোর এস এম সুলতান ফাইন আর্ট কলেজে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রায় ১৪ বছর নড়াইল জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শিশুদের চারুকলা প্রশিক্ষণ দেন। নড়াইল এস এম সুলতান ফাইন আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
১৯৯৫ সালে সুলতান কর্মশালা, ১৯৯৯ সালে হামিদুজ্জামান খান কর্মশালা, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কর্মশালা, ২০১৯ ও ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক চিত্র কর্মশালা এবং ২০২৫ সালে শিল্পকলা উৎসবে অংশগ্রহণ তাঁর নিরবচ্ছিন্ন শিল্পসাধনার সাক্ষ্য বহন করে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে তিনি গুণীজন সম্মাননা পদক লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাঠের ভাস্কর্য ‘৭১-এর মা’ নির্মাণের মাধ্যমে তিনি ইতিহাস ও চেতনার শিল্পরূপ নির্মাণ করেছেন।
সমীর মজুমদারের ছবির মানুষ কোনো বিমূর্ত প্রতীক নয়; তারা শ্রেণির মানুষ—কৃষক, ক্ষেতমজুর, শ্রমজীবী নারী, অনাহারে ক্লান্ত শিশু। তাঁর ক্যানভাসে তারা করুণার অবলম্বন নয়; বরং ইতিহাসের কেন্দ্রীয় শক্তি। লোকজ উপাদানকে তিনি ব্যবহার করেছেন সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে।
৬ মার্চ ২০২৬, শুক্রবার বিকাল ৩টায় নড়াইল জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে তাঁর ৫৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শ্রদ্ধা নিবেদন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। জন্মস্থান আউড়িয়া গ্রামেও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
লাল মাটির থেকে জন্ম নেওয়া এই বিপ্লবী শিল্পী আজ বাংলাদেশের চারুকলা অঙ্গনে এক প্রেরণাদায়ী নাম। তাঁর তুলির আঁচড়ে গ্রামীণ জীবন, মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ এবং মানবিক মূল্যবোধ এক অনন্য ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে।
৬ মার্চে আমরা শুধু একজন শিল্পীকে স্মরণ করি না—আমরা স্মরণ করি এক সাংস্কৃতিক অবস্থানকে, এক নান্দনিক সংগ্রামকে, এক বিপ্লবী চেতনার ধারককে।
শিল্প জনগণের।
শিল্প সংগ্রামের।
শিল্প মুক্ত মানুষের।



