বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের আগমুহূর্ত মানেই নতুন নতুন আলোচনার ঝড়। ঠিক এমন এক সময়ে ভারতীয় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য উইক-এ দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বড়সড় আলোড়ন তুলেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম পরিচিত মুখ মাহফুজ আলম।
তার সরাসরি মন্তব্য, “জামায়াতে ইসলামী আর আওয়ামী লীগ আসলে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।” কথাটা শুনে অনেকেই চমকে উঠেছেন। কারণ, দেশের রাজনীতিতে এই দুই দলের সম্পর্ক নিয়ে এমন খোলামেলা বিশ্লেষণ খুব কমই শোনা যায়।
এই বক্তব্য শুধু একটি মন্তব্য নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, ক্ষমতার চক্র আর ভবিষ্যৎ রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা।
জাতীয় নির্বাচনের আগে মাহফুজ আলমের এই কথাগুলো তাই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আমরা কি সত্যিই একই বৃত্তে ঘুরছি?
মাহফুজ আলমের মতে, আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে টিকে থাকলে জামায়াতও থাকবে। আবার জামায়াত থাকলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্বও নিশ্চিত হয়। তিনি এটাকে রাজনৈতিক সহাবস্থান বলেই দেখেন। যেন এক দল আরেক দলের প্রয়োজন তৈরি করে দেয়। এই জায়গাতেই তিনি জামায়াতকে আওয়ামী লীগের অল্টার ইগো বলে উল্লেখ করেন।
সহজ করে বললে, একজন না থাকলে আরেকজনের ভয় দেখানোর রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। ঠিক যেমন দুই পাশের পাহারাদার একে অপরকে শক্তি দেয়। মাহফুজ আলম মনে করেন, এই সমীকরণ ভাঙা না গেলে বাংলাদেশ বারবার একই রাজনৈতিক গল্প শুনবে।
তার অভিযোগ আরও গভীর। তিনি বলেন, জামায়াত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিষ্কার কোনো ভিশন দেয়নি। রাষ্ট্র কীভাবে চলবে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, আধুনিক সমাজব্যবস্থা কেমন হবে— এসব প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছ থেকে স্পষ্ট নয়।
দ্য উইক-এ প্রচারিত প্রায় সাড়ে ১৪ মিনিটের এই সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আলম শুধু দলীয় রাজনীতি নয়, জুলাই অভ্যুত্থানের পরের হতাশার কথাও বলেছেন। তার ভাষায়, দেড় বছরের যাত্রা অনেকটা বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে যে তরুণ শক্তি রাস্তায় নেমেছিল, তাদের স্বপ্ন ছিল পুরনো রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে নতুন কিছু গড়ার। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, পুরনো বন্দোবস্তই নতুন মোড়কে ফিরে আসছে। এতে করে সেই আন্দোলনের মূল চেতনা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যারা পরিবর্তনের কথা বলেছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত পুরনো শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এই জায়গাটাই তাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে।
মাহফুজ আলমের বড় স্বপ্ন ছিল বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে একটি শক্তিশালী তৃতীয় বিকল্প তৈরি করা। তিনি চেয়েছিলেন জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণদের এক জায়গায় এনে নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়তে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। যখন নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ পুরনো রাজনৈতিক সেটেলমেন্টের অংশ হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে জোট করল, তখন সেই তৃতীয় শক্তির স্বপ্ন ভেঙে পড়ে। তার মতে, পুরনো কাঠামোর অংশ হয়ে গেলে নতুন রাজনীতির কথা বলা শুধু মুখের কথা হয়ে যায়।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট মানেই এমন সব প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া, যার কোনো বাস্তব উত্তর নেই। কারণ, রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে তাদের অবস্থান আজও অস্পষ্ট।
মাহফুজ আলম মনে করেন, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে জামায়াতের আদর্শিক মিল নেই। তরুণরা যে রাষ্ট্র কল্পনা করে, সেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা, মতের ভিন্নতা আর সাংস্কৃতিক সহাবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ।
জামায়াতের রাজনীতি সেই জায়গায় গিয়ে আটকে যায়। ফলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তাদের মেলবন্ধন সম্ভব নয় বলেই তিনি মনে করেন। এই বাস্তবতাই ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
মাহফুজ আলম শুধু সমালোচনা করেই থেমে থাকেননি। তিনি ভবিষ্যৎ সরকার ব্যবস্থা নিয়েও সতর্ক করেছেন। তার মতে, ক্ষমতায় বিএনপি আসুক বা জামায়াত আসুক, সমাজের ভেতরের ক্ষত সারাতে না পারলে কোনো সরকারই টিকবে না।
তিনি বলেন, সংস্কার শুধু কাগজে-কলমে হলে চলবে না। সমাজের ভেতরে ভিন্ন মত, ভিন্ন ধর্ম আর ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে নতুন করে বোঝাপড়া তৈরি করতে হবে। না হলে মব ভায়োলেন্স আর বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকবে।
একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। দেয়ালে ফাটল থাকলে শুধু রঙ করলেই বাড়ি মজবুত হয় না। ভেতরের কাঠামো ঠিক না করলে বিপদ আসবেই।
সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও কড়া কথা বলেন মাহফুজ আলম। তার মতে, বাংলাদেশের মানুষ এখন গণমাধ্যমকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না।
এই বিশ্বাস ফেরাতে হলে গণমাধ্যমকে নিজেদের অতীত ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে হবে। কোথায় ভুল হয়েছে, কোথায় পক্ষপাত ছিল— এসব বিষয়ে জনগণের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতে হবে। এক ধরনের বোঝাপড়ার জায়গায় না এলে আস্থা ফিরবে না বলেই তিনি মনে করেন।
বর্তমানে রাজনীতি থেকে দূরে আছেন মাহফুজ আলম। সময় কাটাচ্ছেন বই পড়ে আর হতাশ তরুণদের সঙ্গে কথা বলে। তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন, কেন জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা গেল না।
এই তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ আর প্রশ্নের ভেতরেই তিনি ভবিষ্যতের পথ খুঁজছেন। তার মতে, নতুন রাজনীতি গড়তে হলে আগে এই প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তর দিতে হবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়েন। এর তিন দিনের মাথায়, ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার।
এরপর ২৮ আগস্ট মাহফুজ আলম প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব নেন। একই বছরের ১০ নভেম্বর তিনি সরকারের উপদেষ্টা হন। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।
এই অভিজ্ঞতাই তাকে রাজনীতির ভেতরের বাস্তব চিত্র খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। আর সেই অভিজ্ঞতার আলোকে দেওয়া তার মন্তব্য আজ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জামায়াত ও আওয়ামী লীগকে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বলার পেছনে শুধু রাজনৈতিক আক্রমণ নেই। আছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠিন বিশ্লেষণ। এই বিশ্লেষণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।


