বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ছাত্রদল ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র পৃথক দুটি সমাবেশ। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশগুলো থেকে উঠে এসেছে নির্বাচনী বার্তা, রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান এবং দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র গঠনের দৃষ্টিভঙ্গি।
ছাত্রদলের শাহবাগ সমাবেশ: রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি
ঢাকার শাহবাগে অনুষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বিশাল সমাবেশে অংশগ্রহণ করে বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতারা, যেখানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এই সমাবেশ ছিল গণ অভ্যুত্থানের পর ছাত্রদলের প্রথম বড় মাপের প্রকাশ্য কর্মসূচি, যেখানে অংশগ্রহণ করে দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাকর্মীরা।
তারুণ্যের কাছে বার্তা: “প্রথম ভোট ধানের শীষে“
তারেক রহমান তার বক্তব্যে সরাসরি আহ্বান জানান তরুণ ভোটারদের প্রতি, যাতে তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেন।
তিনি বলেন,
“এই দেশে পরিবর্তন আসবেই। আর সেই পরিবর্তনের নেতৃত্বে থাকবে ছাত্রসমাজ।”
তিনি আরও বলেন,
“বাংলাদেশের মানুষ বিরোধ আর প্রতিশোধের রাজনীতি চায় না। তারা চায় রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন।”
চরমপন্থা ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান
তারেক রহমান ছাত্রদলের কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান ফ্যাসিবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থার উত্থান ঠেকাতে।
তিনি উল্লেখ করেন,
“এই বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ আর ফিরে আসবে না—এই অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের রাজনীতি করতে হবে।”
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী পূর্বাভাস: তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত
ছাত্রদলের সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,
“ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন হবে এবং তারেক রহমান দেশে ফিরে আসবেন”।
এই ঘোষণাটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন উত্তেজনার সঞ্চার ঘটিয়েছে।
এনসিপি’র কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ: দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র ও ২৪ দফা ইশতেহার
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গণ অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজন করে একটি ঐতিহাসিক সমাবেশ।
এই সমাবেশ থেকে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেন “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র” গঠনের ২৪ দফা ইশতেহার।
মূল দফাসমূহের মধ্যে রয়েছে:
- নতুন সংবিধান প্রণয়ন
- জুলাই অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি ও বিচার
- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার
- সেবামুখী প্রশাসন গঠন ও দুর্নীতি দমন
- জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গঠন
- স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত বিলোপ
- অলিগার্কদের প্রভাবমুক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো গঠন
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য: ‘ফ্যাসিবাদ পতন হলেও কাঠামো টিকে আছে’
তিনি বলেন,
“আমরা দেখতে পাচ্ছি, ফ্যাসিবাদ সরকারের পতন ঘটেছে, কিন্তু ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ ঘটেনি।”
তিনি আরও বলেন,
“আমরা এমন গণতন্ত্র চাই, যেখানে শুধু নির্বাচনের দিন নয়, বরং প্রতিদিন জনগণের হাতে ক্ষমতা থাকবে।”
‘জুলাই সনদ’ ঘোষণার দাবি ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতা
নাহিদ ইসলাম ও অন্যান্য এনসিপি নেতারা বলেন,
“২৪ দফা বাস্তবায়নে আমাদের একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।”
তারা দাবি করেন,
“এই ইশতেহার একটি জাতীয় আলোচনার ভিত্তি হতে পারে, যার মাধ্যমে আমরা সত্যিকার অর্থে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে পারি।”
সাধারণ জনগণের ক্ষোভ: আন্দোলনে ছিলাম, আজ ডাক পড়ে না
সমাবেশের বাইরে দাঁড়িয়ে রিকশাচালক ফরিদুল ইসলাম বলেন,
“চব্বিশের বিপ্লবে আমরাও ছিলাম। আহতদের হাসপাতালে নিয়েছি। কিন্তু আজ আমাদের কেউ ডাকে না।”
তার কথায় উঠে আসে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবহেলার প্রতিচ্ছবি, যারা একসময় রাস্তায় রক্ত ঝরিয়েছে, আজ তারা ভুলে যাওয়া ইতিহাস।
সমাবেশ ঘিরে নগরবাসীর দুর্ভোগ ও যানজট
একই দিনে এইচএসসি পরীক্ষা ও সরকারি কর্ম কমিশনের পরীক্ষা চলছিল, পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন স্থানে তিনটি বড় রাজনৈতিক দলের সমাবেশ।
ফলে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট ও নাগরিক ভোগান্তি।
হাসপাতালের কাছাকাছি এমন কর্মসূচি হওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
বারডেমে চিকিৎসা নিতে আসা নাদিরা আক্তার বলেন,
“এত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার দিনে সভা-সমাবেশ হাসপাতালের পাশে করা ঠিক হয়নি।”
রাজনীতির নতুন গতি: কী দেখাচ্ছে এই দুটি সমাবেশ?
এই দুটি সমাবেশ দেখিয়েছে তরুণদের সক্রিয়তা, গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও রাজনৈতিক সংস্কারের অভিলাষ।
ছাত্রদলের তরুণ নেতৃত্ব ও এনসিপির বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনৈতিক রূপরেখা আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই দুই দল যে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট—বাংলাদেশে রাজনীতির মাঠ এখন শুধুই ক্ষমতা দখলের নয়, বরং একটি নতুন রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের লড়াই।


