বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংবিধান সংস্কার ইস্যু নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। দলটি জানিয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এখনই শপথ নেবেন না। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা।
মঙ্গলবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় শপথ অনুষ্ঠান শুরুর আগে কক্সবাজার–১ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দলের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, সংবিধানের যথাযথ বিধান না থাকায় এখনই শপথ নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা সংবিধানকে সবসময় গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং আইন মেনেই রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়েও তারা আইনি কাঠামোর বাইরে যেতে চায় না।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাদের হাতে যে দুটি ফরম দেওয়া হয়েছে, তা সংবিধানের বর্তমান কাঠামোর মধ্যে এখনো অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অর্থাৎ সংবিধানে এই পরিষদের অস্তিত্ব বা কাঠামো স্পষ্টভাবে যুক্ত না থাকলে সেই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।
তার মতে, গণভোটের মাধ্যমে যদি সংবিধান সংস্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, তাহলে প্রথমে সেই পরিষদের কাঠামো সংবিধানের অংশ হিসেবে যুক্ত করতে হবে। এরপরই পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হতে পারে।
বিএনপির বক্তব্যে মূলত একটি বিষয়ই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, সেটি হলো আইনগত স্বচ্ছতা। তাদের দাবি, সংবিধানে যেকোনো নতুন সংযোজন করতে হলে সেটি সংসদে অনুমোদিত হতে হবে এবং তৃতীয় তফসিলে যুক্ত করতে হবে।
তারা মনে করে, সংবিধানে স্পষ্টভাবে না থাকলে কোনো পরিষদ বা পদে শপথ নেওয়া সাংবিধানিকভাবে দুর্বল অবস্থান তৈরি করতে পারে। তাই তারা চায় প্রথমে আইনি কাঠামো ঠিক হোক, তারপরই শপথের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, দলটি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং আইনি ভিত্তি শক্ত করার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন। কারণ, শপথ গ্রহণ মানে কোনো কাঠামোকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেওয়া। বিএনপি চাইছে না, কোনো অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা সেই কাঠামোকে বৈধতা দিক।
সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করে বলেন, তারা এখন পর্যন্ত সংবিধান মেনেই চলেছেন এবং ভবিষ্যতেও সেই পথেই এগোতে চান। তাই সংবিধানে বিষয়টি যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করতে রাজি।
এই বক্তব্যে দলটির সতর্ক অবস্থান পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তারা তাড়াহুড়ো করে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইছে না।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রশ্নে গণভোটের ফলাফলকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিএনপি। তাদের মতে, জনগণের রায়ের ভিত্তিতে যদি এই পরিষদ গঠিত হয়, তাহলে সেটি সংবিধানের অংশ হিসেবে যুক্ত করতে হবে।
তারপর সংসদে আলোচনা ও অনুমোদনের মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত হলে পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণের বিধান তৈরি করা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে তখনই তারা শপথ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
এখানে দলটি মূলত একটি স্বচ্ছ ও ধাপে ধাপে প্রক্রিয়ার কথা বলছে।
এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত মত নয়, বরং দলীয়ভাবে নেওয়া একটি অবস্থান। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তিনি দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশে এবং তার উপস্থিতিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।
এর মাধ্যমে বোঝা যায়, বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট কৌশল ঠিক করা হয়েছে। তারা মনে করছে, আগে সংবিধানের কাঠামো ঠিক করা দরকার, তারপর অন্য সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা উচিত।
সংবিধান একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন। এটি দেশের শাসনব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার এবং রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করে। তাই এই সংবিধানে কোনো পরিবর্তন বা সংযোজন করতে হলে সেটি খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন মানে হলো দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামো নিয়ে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া। এজন্য এই পরিষদের সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই বিএনপি চাইছে না, কোনো অস্পষ্ট অবস্থার মধ্যে তারা শপথ নিয়ে এমন একটি প্রক্রিয়ার অংশ হোক, যার ভিত্তি এখনো পুরোপুরি আইনি কাঠামোর মধ্যে আসেনি।
এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। কেউ এটিকে আইনি সচেতনতার উদাহরণ হিসেবে দেখছে, আবার কেউ বলছে এটি রাজনৈতিক কৌশল।
তবে দলটির অবস্থান স্পষ্ট। তারা বলছে, সংবিধানকে সম্মান জানিয়ে তারা সবসময় কাজ করেছে এবং আগামীতেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়।
এতে করে বোঝা যায়, তারা নিজেদের অবস্থানকে আইনি ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে শক্ত রাখতে চাচ্ছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান। যদি সংসদে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয় এবং সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে যুক্ত হয়, তাহলে পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার পথ খুলে যাবে।
সেই সময় বিএনপি তাদের অবস্থান নতুন করে বিবেচনা করতে পারে। কারণ তখন আইনি কাঠামো পরিষ্কার থাকবে এবং শপথ নেওয়ার বিধানও নির্ধারিত থাকবে।
বিএনপির এই সিদ্ধান্তকে একদিকে আইনি সতর্কতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা বলছে, সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে তারা আগ্রহী নয়।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং সদস্যদের শপথ গ্রহণের বিষয়টি এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ওপর। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



