বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এক বক্তব্যে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী আচরণ এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে তীব্র সমালোচনা করেছেন। ৩ জুলাই বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে ছাত্রদলের একটি সমাবেশে তিনি বলেন, “আমাদের পাশের দেশে ফ্যাসিস্ট হাসিনা আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকেই দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।”
এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মঞ্চে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। অনেকে এটিকে প্রবাস থেকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনার অভিযোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে বিএনপির রাজনৈতিক পুনরুত্থানের ঘোষণা হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন।
ছাত্রদলের ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ উপলক্ষে আয়োজিত ছাত্রসমাবেশ
শাহবাগে অনুষ্ঠিত এই ছাত্রসমাবেশ ছিল ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান, শোক ও বিজয়ের প্রথম বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে। এই দিনটিকে ছাত্রদল স্মরণ করে একটি ইতিহাস পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে। সমাবেশে অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীদের গলায় ছিল প্রতিশোধের ভাষা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রত্যয়।
মির্জা ফখরুল বলেন—
“নতুন একটা সূর্য উঠেছে। এই সূর্য আলোকিত করবে আমাদের সকলকে। আমাদের সামনে একটি সুযোগ এসেছে নতুন করে বাংলাদেশকে নির্মাণ করার।”
তার এই বক্তব্যে ছিল অতীতের শহীদ ছাত্রদের স্মরণ, বর্তমানের সংকট এবং ভবিষ্যতের মুক্তির আহ্বান।
প্রশাসনের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদের অভিযোগ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকার গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের শীর্ষ নেত্রী এখন বিদেশে থেকে দলীয় লোকজনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিতর থেকে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।
“আজ আমাদের সবাইকে শপথ নিতে হবে—ফ্যাসিস্ট হাসিনা যেন আর কখনো দেশটাকে ধ্বংস করতে না পারে।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ছাত্রসমাজকে আহ্বান জানান, “মৃত্যুর ভয়কে জয় করে রাজপথে নামার”।
নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান
সমাবেশে মির্জা ফখরুল বিশেষভাবে ছাত্রদের প্রতি আহ্বান জানান—
“আজ আমাদের সামনে যে সুযোগ এসেছে, তা কাজে লাগিয়ে একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। একবিংশ শতাব্দীর ছাত্র সমাজ যদি আন্দোলনের পুরোভাগে না থাকে, তাহলে জাতি কখনো মুক্তি পাবে না।”
তিনি স্মরণ করেন, এক বছর আগে এই দিনে অনেক ছাত্র প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে নিখোঁজ হয়েছেন, অনেককে গুম করা হয়েছে। এই ত্যাগের কথা মনে রেখে ছাত্র সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অনুরোধ জানান।
তথ্য ও বাস্তবতা: ফ্যাসিস্ট শব্দের ব্যাখ্যা
রাজনীতিতে ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটি বরাবরই একটি বিতর্কিত এবং তীব্র প্রতীকী অর্থবাহী শব্দ। এর মাধ্যমে সাধারণত একনায়কতান্ত্রিক শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতার হরণ, বিরোধীদের দমন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
মির্জা ফখরুল যখন শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট হিসেবে আখ্যা দেন, তখন তিনি মূলত অভিযোগ করছেন:
- গণতন্ত্রের পরিপন্থী প্রশাসনিক আচরণ
- বিরোধী দলগুলোর সভা-সমাবেশে বাধা
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে বিরোধীদের হয়রানি
- বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে মত প্রকাশ দমন
প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক উত্তেজনা
সরকারি দলের পক্ষ থেকে এখনও এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না এলেও, রাজনৈতিক মহলে এই বক্তব্য তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো এটিকে ‘উস্কানিমূলক ও মিথ্যাচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে।
তারা বলছে, শেখ হাসিনা দেশেই আছেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। তাদের দাবি, বিএনপি অভিযোগের রাজনীতিতে ফিরে গেছে।
ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ ও মির্জা ফখরুলের বার্তা
বিএনপির মহাসচিব ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন—
“ছাত্র আন্দোলন ছাড়া দেশে কোনো পরিবর্তন আসেনি, আসবেও না। তোমাদের বুকের রক্তেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মিত হবে।”
এই বক্তব্যে ছাত্র সমাজকে দেশের রাজনৈতিক গতিপথে সরাসরি যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। নতুন প্রজন্মকে ‘আন্দোলনের ধারক ও বাহক’ হিসেবে দেখেন মির্জা ফখরুল।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ডাক: প্রতিজ্ঞা ও প্রস্তুতি
মির্জা ফখরুল বলেন—
“আজকের দিনটা শুধু স্মরণ করার নয়, শপথ নেওয়ার দিন। আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। সময় এসেছে রাস্তায় নামার, সময় এসেছে ভাঙনের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়ার।”
তিনি আভাস দেন যে, আগামী দিনে বিএনপি আরও বৃহৎ আন্দোলনে নামবে এবং সেটি “চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থানের” দিকে ধাবিত হবে।


