নির্বাচনের ঠিক আগের রাত—যে সময়টা সাধারণত সবচেয়ে স্পর্শকাতর বলে ধরা হয়—সেই সময়কে ঘিরেই তীব্র অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটি দাবি করেছে, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তারা মোট ১২৭টি অভিযোগ পেয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা, ভোটকেন্দ্র দখল, জালভোট প্রদান এবং সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু ভোটারদের হুমকি দেওয়ার মতো গুরুতর বিষয়।
এই অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য কতটা উদ্বেগজনক—সেই প্রশ্নও উঠছে জনমনে।
নির্বাচনের আগের রাতকে অনেকেই বলেন ‘গেম চেঞ্জার’ সময়। এই সময়টাতেই প্রার্থীরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নেন, কর্মীরা কেন্দ্রভিত্তিক সমন্বয় করেন, আর ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের শেষ চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই সময়টাকেই ব্যবহার করা হয়েছে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য।
বিএনপির দাবি, বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের প্রভাবিত করতে নগদ টাকা বিতরণের চেষ্টা হয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, ভোটকেন্দ্র দখলের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল যাতে ভোটের দিন স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়। এমনকি জালভোট দেওয়ার প্রস্তুতির কথাও তারা বলছেন।
বুধবার রাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
তিনি বলেন, তারা ভেবেছিলেন সাম্প্রতিক গণআন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছেন, সবাই শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই থাকবেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য যদি কেউ এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, তা দুঃখজনক এবং অগ্রহণযোগ্য।”
নজরুল ইসলাম খান স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে একটি বিশেষ দল পরিকল্পিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে। তিনি অভিযোগ করেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়িয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করা হচ্ছে।
ভোট কেনা—এই শব্দটা শুনলেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি টাকা দিয়ে ভোটের ফল বদলে দেওয়া যায়? বিএনপির দাবি, বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের নগদ অর্থ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তাদের মতে, এতে করে ভোটের স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তবে রাজনীতির মাঠে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ নতুন কিছু নয়। অনেক সময় এসব অভিযোগ নির্বাচনী কৌশলের অংশও হতে পারে। কিন্তু যখন অভিযোগের সংখ্যা ১২৭-এ পৌঁছায়, তখন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
ভোটকেন্দ্র দখল ও জালভোট দেওয়ার অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন নির্বাচনে এ ধরনের অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রতিবারই প্রশ্ন ওঠে—নির্বাচন কমিশন কতটা কার্যকরভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে?
বিএনপির বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু এলাকায় ভোটের আগের রাতেই কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। যদি সত্যিই এমন কিছু ঘটে থাকে, তাহলে তা নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য বড় ধরনের হুমকি। কারণ ভোটাররা যদি মনে করেন তাদের ভোট সুরক্ষিত নয়, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
অভিযোগের তালিকায় সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো হিন্দু ভোটারদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ। বিএনপি দাবি করেছে, কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটারদের ভয় দেখানো হয়েছে যাতে তারা ভোটকেন্দ্রে না যান বা নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংখ্যালঘু ভোট সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ফলে এই ধরনের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার থাকা উচিত—এটাই সংবিধানের মূল কথা। তাই এমন অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তাঁর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় পর্যায়ে গুজব ছড়িয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।
বর্তমান সময়ে ফেক নিউজ বা ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া খুব সহজ। একটি মিথ্যা খবর কয়েক মিনিটেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে ভোটের আগে এমন বিভ্রান্তি তৈরি হলে ভোটারদের সিদ্ধান্তেও প্রভাব পড়তে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে লক্ষীপুরের একটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির কেন্দ্র খরচের ১৫ লাখ টাকা নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
নির্বাচনের আগের রাতে প্রার্থীরা কেন্দ্র খরচের জন্য অর্থ পাঠান—এটি একটি প্রচলিত প্রক্রিয়া বলে তিনি দাবি করেন। কিন্তু সেই অর্থকে ঘিরে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে—কেন্দ্র খরচের অর্থ আর ভোট কেনার অর্থের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট না হলে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
এই ১২৭ অভিযোগ এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে বিএনপি বলছে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা হয়েছে, অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ কী বলছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত—এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন মানেই প্রতিযোগিতা, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি ন্যায্য না হয়, তাহলে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। ভোটের ফল যাই হোক, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোটারদের বিশ্বাস বজায় রাখা।
প্রতিটি নির্বাচন আসলে একটি দেশের গণতন্ত্রের পরীক্ষা। সেখানে যদি অভিযোগের পাহাড় জমে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হচ্ছে?
বিএনপির ১২৭ অভিযোগ এখন তদন্ত ও যাচাইয়ের বিষয়। তবে একথা নিশ্চিত, নির্বাচনকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে তা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
শেষ পর্যন্ত জনগণই ঠিক করবে কার বক্তব্য কতটা বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। তাই অভিযোগ যেদিক থেকেই আসুক, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং যথাযথ তদন্ত করা সময়ের দাবি।


