বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তনের সময় দাঁড়িয়ে আছি আমরা। প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থান করার পর দেশে ফিরে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এই পরিবর্তন শুধু দেশের ভেতরেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তাহলে প্রশ্নটা সহজ—বাংলাদেশের জন্য তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার ভূমিকা কতটা প্রভাব ফেলতে পারে?
১৭ বছরের প্রবাসজীবন শেষ করে দেশে ফেরার পর খুব দ্রুত রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় হন তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তন এমন সময়ে, যখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল অস্থির। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি বদলে যায়। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, গুমের অভিযোগ, মানবাধিকার ইস্যু—সব মিলিয়ে সমাজে ছিল বিভাজন ও অবিশ্বাস।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐক্য গড়া নতুন নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সামাজিক বন্ধনের। আন্দোলনে প্রাণহানি, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন—এসব মানুষের মনে ক্ষত তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিশোধের বদলে পুনর্মিলনকে গুরুত্ব দেওয়া রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়।
তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, প্রতিশোধ দেশের জন্য কিছুই বয়ে আনে না। বরং জাতিকে একসঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে। ভাবো, একটা পরিবারে ঝগড়া হলে যদি সবাই প্রতিশোধ নিতে শুরু করে, তাহলে সম্পর্ক আর টেকে না। রাষ্ট্রও ঠিক তেমনই—ঐক্য ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এই ঐক্যের রাজনীতি সফল হলে তা দক্ষিণ এশিয়ায় গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
যেকোনো দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হলো আইনের শাসন। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এখন বড় কাজ। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা—সব জায়গায় আস্থা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনগণ চায় এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে। নতুন সরকার যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে, আন্তর্জাতিক আস্থা ফিরে আসবে।
এই জায়গাটাই আসলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশ গত এক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। জিডিপি কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু শুধু সংখ্যার উন্নতি মানুষের জীবনের উন্নতি নিশ্চিত করে না।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয়বৈষম্য এবং বেকারত্ব—এগুলো এখন বাস্তব সমস্যা। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু সবার জন্য চাকরি তৈরি করা সহজ নয়। যুব বেকারত্বের হারও উদ্বেগজনক।
এখানেই আসে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তাদের ইশতেহারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—
নারী ও বেকারদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নগদ সহায়তা, ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা, ব্যাংকিং খাত উদারীকরণ,
এবং প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী কর্মীর দক্ষতা উন্নয়ন।
ডিজিটাল খাত নিয়ে ভাবলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। আজকে গ্রামের একজন তরুণও মোবাইল ফোন দিয়ে অনলাইন ব্যবসা শুরু করতে পারে। যদি সরকার নীতি সহায়তা দেয়, তাহলে হাজার হাজার ছোট উদ্যোগ বড় শিল্পে রূপ নিতে পারে।
বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি সীমাবদ্ধতা, শিল্পখাতের চাপ—এসব সামলাতে হলে বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্কার জরুরি। এই জায়গায় সফলতা মানে শুধু অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় হওয়া।
বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হলো ভারত। ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা—সব দিক থেকেই এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন চুক্তি ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনে জয় নিশ্চিত হওয়ার পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এটি ইতিবাচক সংকেত। তবে নতুন সরকার জানিয়েছে, যেসব চুক্তিতে অসামঞ্জস্য আছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে।
এখানে মূল বিষয় হলো জাতীয় স্বার্থ। একদিকে ভালো প্রতিবেশী সম্পর্ক, অন্যদিকে দেশের স্বার্থ রক্ষা—এই ভারসাম্যই কূটনীতির আসল পরীক্ষা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বড় অংশে নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর। তাই যুক্তরাষ্ট্র এর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে কমানো হয়। ভবিষ্যতে বাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ভারসাম্য এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব—এসব বিষয় নতুন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে।
যদি বাংলাদেশ দক্ষ কূটনীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, তাহলে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতায় নিজের অবস্থান আরও মজবুত করতে পারবে।
নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অতীতে জোট থাকলেও এবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিএনপি।
এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের সামনে প্রশ্ন—সব রাজনৈতিক শক্তিকে কীভাবে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা যায়? তারেক রহমান বলেছেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়, বরং মতের ভিন্নতাকে সহ্য করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। এই জায়গায় সফলতা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।
সাম্প্রতিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। পরবর্তীতে তারা জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেয়।
তরুণ প্রজন্ম এখন শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব পরিবর্তন চায়। কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন—এসব তাদের প্রত্যাশা। আন্দোলনে প্রাণ হারানোদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতাও বড় বিষয়।
একটি নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া মানে ভবিষ্যতের নেতৃত্বের ভিত্তি তৈরি হওয়া।
বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি নিশ্চিত করতে পারলে দেশটি আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব সফল হলে এটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে। আর ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আবারও ফিরে আসতে পারে।
সবকিছুর শেষে আসল প্রশ্ন একটাই—ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।
বাংলাদেশের মানুষ এখন অপেক্ষায়। পরিবর্তনের এই অধ্যায় সত্যিই নতুন দিগন্ত খুলে দেয় কি না, সেটাই সময় বলে দেবে।


