অবশেষে শেষ হলো দীর্ঘ অপেক্ষা। বহু প্রতীক্ষিত সেই মুহূর্তে ঢাকায় পৌঁছেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে তাকে বহনকারী বিমানটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এই অবতরণের মধ্য দিয়ে ১৭ বছরের নির্বাসনের একটি অধ্যায় শেষ হয়ে শুরু হলো নতুন এক রাজনৈতিক পথচলা।
ঢাকায় তার আগমনকে ঘিরে শুধু বিমানবন্দর নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আবেগ, উচ্ছ্বাস আর কৌতূহল। বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে এটি নিছক একটি আগমন নয়, বরং দীর্ঘ লড়াইয়ের এক প্রতীকী বিজয়।
সিলেট থেকে ঢাকায় যাত্রার পুরো সময়রেখা
তারেক রহমানকে বহনকারী বিমানটি বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার কিছু পর সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। এর আগে সকাল ১০টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট বিজে ২০২ সিলেট বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
সেখানে প্রায় এক ঘণ্টার যাত্রাবিরতি শেষে বিমানটি পুনরায় উড্ডয়ন করে। সিলেট থেকে ঢাকায় এই প্রায় ৫০ মিনিটের আকাশপথের যাত্রা রাজনৈতিকভাবে যতটা সংক্ষিপ্ত, আবেগের দিক থেকে ছিল ততটাই দীর্ঘ।
দেশের আকাশে ফিরে আবেগঘন ফেসবুক বার্তা
দেশের আকাশসীমায় প্রবেশের পর তারেক রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর অর্থবহ পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, “দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর বাংলাদেশের আকাশে।”
এই একটি লাইনের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে তার দীর্ঘ প্রবাসজীবন, অপেক্ষা আর দেশে ফেরার অনুভূতি।
এই পোস্ট মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। বিএনপি নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও পোস্টটি শেয়ার করে নিজেদের আবেগ প্রকাশ করেন।
বিমানবন্দর থেকে নজর রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায়
তারেক রহমানের ঢাকায় পৌঁছানোর খবরে রাজধানীর পূর্বাচল এলাকায় উৎসবের আমেজ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় করে রাখতে রাজধানীর ৩০০ ফিট (পূর্বাচল) এলাকায় তৈরি করা হয়েছে এক সুবিশাল মঞ্চ।
এই মঞ্চকে ঘিরেই জড়ো হচ্ছেন রাজধানীসহ সারাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের বিএনপি নেতাকর্মীরা। কেউ এসেছেন ভোরে, কেউ আবার রাতেই ঢাকায় পৌঁছেছেন। সবার চোখে একটাই প্রত্যাশা—নিজ চোখে প্রিয় নেতার প্রত্যাবর্তন দেখা।
স্লোগান, প্ল্যাকার্ড আর উচ্ছ্বাসে মুখর ৩০০ ফিট
৩০০ ফিট এলাকা এখন আর শুধু একটি সড়ক নয়। এটি যেন রূপ নিয়েছে এক বিশাল উৎসবকেন্দ্রে। চারপাশে স্লোগানের ধ্বনি, হাতে হাতে প্ল্যাকার্ড, ব্যানার আর দলীয় পতাকা। নেতাকর্মীদের কণ্ঠে কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে স্বাগত জানানো স্লোগান।
অনেকের চোখে মুখে ক্লান্তি থাকলেও আবেগে কোনো ঘাটতি নেই। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ লাইভ করছেন, আবার কেউ পুরোনো দিনের গল্পে মেতে উঠছেন। পুরো এলাকাজুড়ে বিরাজ করছে এক ধরনের মিলনমেলা।
কেন তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এত গুরুত্বপূর্ণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা বিএনপির রাজনীতিতে একটি বড় মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। দীর্ঘদিন বিদেশে থেকেও তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনায় সক্রিয় ছিলেন। তবে সরাসরি মাঠে উপস্থিত না থাকার যে শূন্যতা ছিল, তার অবসান হলো আজ।
তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করছেন, তার প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দল আরও সংগঠিত হবে এবং মাঠের রাজনীতিতে নতুন গতি আসবে।
৩০০ ফিটে সংবর্ধনা ও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
ঢাকায় পৌঁছানোর পর তারেক রহমান সরাসরি যাবেন রাজধানীর পূর্বাচলের জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে, যা ৩০০ ফিট এলাকা নামে পরিচিত। সেখানে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বক্তৃতা দেবেন।
এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। দীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরে তিনি কী বার্তা দেন, কীভাবে ভবিষ্যৎ রাজনীতির রূপরেখা তুলে ধরেন—সেদিকেই তাকিয়ে আছে সবাই।
মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ: আবেগঘন আরেক অধ্যায়
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান যাবেন এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখানে তিনি তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে যাবেন। দীর্ঘদিন পর মা-ছেলের এই সাক্ষাৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও রয়েছে গভীর আবেগ।
অনেকে বলছেন, এটি শুধু পারিবারিক সাক্ষাৎ নয়, বরং বিএনপির রাজনীতিতে এক প্রতীকী মুহূর্ত।
এক দিনের মধ্যেই ইতিহাস
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তারেক রহমানের ঢাকায় পৌঁছানো বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে এক ঐতিহাসিক দিন। বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট—সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে আবেগ, উচ্ছ্বাস আর প্রত্যাশা।
এই দিনটি শুধু একটি আগমনের গল্প নয়। এটি দীর্ঘ নির্বাসনের শেষ, নতুন রাজনৈতিক যাত্রার শুরু এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।


