প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন গুঞ্জন উঠল। বলা হচ্ছে, Apple খুব শিগগিরই একটি কম দামের ম্যাকবুক বাজারে আনতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি ম্যাকবুক প্রো বা ম্যাকবুক এয়ারের মতো শক্তিশালী হবে—এমন দাবি কেউ করছে না। বরং ফাঁস হওয়া তথ্য বলছে, খরচ কমাতে কিছু জায়গায় আপস করেছে কোম্পানি।
একটি অভ্যন্তরীণ macOS টেস্ট বিল্ড বিশ্লেষণ করে নতুন এই বাজেট ম্যাকবুকের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, চিপ থেকে শুরু করে চার্জিং, ডিসপ্লে সেন্সর—সবখানেই খরচ বাঁচানোর চেষ্টা স্পষ্ট।
চলুন সহজভাবে পুরো বিষয়টা বুঝে নেওয়া যাক।
বাজেট ম্যাকবুকে আসছে A18 Pro চিপ
সবচেয়ে বড় খবর হচ্ছে—নতুন ম্যাকবুকে এম-সিরিজের বদলে আইফোনের এ-সিরিজ চিপ ব্যবহার করা হতে পারে। ফাঁস অনুযায়ী, এতে থাকতে পারে A18 Pro প্রসেসর, যা সাধারণত আইফোনের প্রিমিয়াম মডেলে ব্যবহৃত হয়।
এটা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এম-সিরিজ চিপ বানাতে খরচ বেশি পড়ে। কিন্তু এ-সিরিজ চিপ ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ কমে যায়। সহজ ভাষায় বললে, কোম্পানি পারফরম্যান্স একটু কমিয়ে দাম কমাতে চাইছে।
যারা সাধারণ কাজ—যেমন ব্রাউজিং, অনলাইন ক্লাস, অফিস ডকুমেন্ট—এই ধরনের ব্যবহার করেন, তাদের জন্য এই চিপ যথেষ্ট হতে পারে। তবে ভারী ভিডিও এডিটিং বা বড় সফটওয়্যার চালাতে গেলে সীমাবদ্ধতা বোঝা যেতে পারে।
True Tone ফিচার নাও থাকতে পারে
ফাঁস হওয়া তথ্যের আরেকটি বড় দিক হলো—নতুন মডেলে True Tone সাপোর্ট নাও থাকতে পারে। macOS বিল্ডে “AppleALSColorSensor” ড্রাইভার অনুপস্থিত পাওয়া গেছে। এর বদলে পুরোনো লাইট সেন্সর ব্যবহারের ইঙ্গিত মিলেছে।
True Tone আসলে কী করে? ধরুন আপনি রোদে বসে ল্যাপটপ ব্যবহার করছেন, তারপর ঘরের ভিতরে এলেন। এই ফিচার স্ক্রিনের রঙ পরিবেশ অনুযায়ী সামঞ্জস্য করে, যাতে চোখে স্বাভাবিক লাগে।
এখন প্রশ্ন—এটা না থাকলে সমস্যা কতটা?
সত্যি বলতে, সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য খুব বড় ক্ষতি নয়। যারা পেশাদার ডিজাইন, ফটো কালার গ্রেডিং বা প্রিন্ট কাজ করেন, তাদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন ছাত্র বা অফিস ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন কাজে এটি না থাকলেও খুব একটা সমস্যা হবে না।
দ্রুত চার্জিং সুবিধা বাদ পড়তে পারে
আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো—নতুন ম্যাকবুকে দ্রুত চার্জিং নাও থাকতে পারে। ফাঁস হওয়া বিল্ডে “AppleHighVoltageCharger” ড্রাইভারের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
এর মানে কী দাঁড়ায়?
সহজভাবে বললে, ল্যাপটপটি চার্জ হবে, কিন্তু আগের মতো দ্রুত গতিতে নয়। ধরুন, আগে যেখানে এক ঘণ্টায় অনেকটা চার্জ হতো, সেখানে হয়তো একটু বেশি সময় লাগবে।
বাজেট কমাতে এই ধরনের সিদ্ধান্ত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো প্রায়ই নেয়। তাই এটাকে অবাক করার মতো কিছু বলা যায় না।
Wi-Fi মডিউলে বড় পরিবর্তন
নতুন ম্যাকবুকে Wi-Fi নিয়েও কিছু বদল আসতে পারে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এতে “AppleSunrise” ড্রাইভার ব্যবহারের ইঙ্গিত রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এখানে MediaTek-এর Wi-Fi মডিউল ব্যবহার করা হতে পারে।
এর ফলে কী হতে পারে?
সম্ভবত এতে সর্বশেষ Wi-Fi 7 বা Bluetooth 6 সাপোর্ট থাকবে না। তবে বাস্তব কথা হলো—বেশিরভাগ সাধারণ ব্যবহারকারী এখনো Wi-Fi 6-ই পুরোপুরি ব্যবহার করেন না। তাই বাজেট ব্যবহারকারীদের জন্য এটি বড় সমস্যা নাও হতে পারে।
অডিও সিস্টেমেও থাকতে পারে সীমাবদ্ধতা
ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন মডেলে পুরোনো “AppleCS42L83Audio” ড্রাইভার ব্যবহার করা হতে পারে। এটি আগের এক প্রজন্মের ম্যাকবুক এয়ারের সঙ্গে মিল রয়েছে।
এর সম্ভাব্য প্রভাব কী?
উচ্চ-ইম্পিডেন্স (high-impedance) হেডফোন সাপোর্ট নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ যারা স্টুডিও মানের হেডফোন ব্যবহার করেন, তারা সীমাবদ্ধতা অনুভব করতে পারেন। কিন্তু সাধারণ ইয়ারফোন বা ব্লুটুথ হেডফোন ব্যবহারকারীদের জন্য এটি বড় বিষয় নয়।
উৎপাদন খরচ কমানোর স্পষ্ট কৌশল
পুরো ফাঁস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই ম্যাকবুক তৈরি হচ্ছে খরচ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে।
যেসব জায়গায় আপস হতে পারে:
প্রসেসরে এম-সিরিজের বদলে এ-সিরিজ
দ্রুত চার্জিং বাদ
উন্নত ডিসপ্লে সেন্সর বাদ
নতুন Wi-Fi স্ট্যান্ডার্ড বাদ
তবে মজার বিষয় হলো, কেসিংয়ে অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার চালু থাকতে পারে। অর্থাৎ বাইরে থেকে দেখতে এখনো প্রিমিয়াম ফিল বজায় রাখতে চায় কোম্পানি।
এছাড়া নতুন রঙের অপশনও আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা তরুণ ব্যবহারকারীদের আকর্ষণ করবে।
সম্ভাব্য দাম কত হতে পারে
বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন বাজেট ম্যাকবুকের দাম হতে পারে প্রায় ৬৯৯ থেকে ৭৫০ ডলারের মধ্যে।
এই দামের লক্ষ্য একেবারে পরিষ্কার—Chromebook মার্কেটকে চ্যালেঞ্জ করা।
অনেক শিক্ষার্থী বা সাধারণ ব্যবহারকারী আছেন, যারা macOS চান কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় কিনতে পারেন না। এই মডেল মূলত তাদের জন্যই তৈরি হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
১৩-ইঞ্চি ডিসপ্লে ও সীমিত মেমোরির ইঙ্গিত
ফাঁস অনুযায়ী, নতুন ডিভাইসে ১৩-ইঞ্চি ডিসপ্লে থাকতে পারে। তবে রেজোলিউশন ও ডিসপ্লে কোয়ালিটি বর্তমান প্রিমিয়াম ম্যাকবুকগুলোর মতো নাও হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা—বেস মেমোরি ৮GB-এ সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য এটি এখনো ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু যারা ভারী মাল্টিটাস্কিং করেন, তারা ভবিষ্যতে আপগ্রেড অপশন খুঁজতে পারেন।
ফাঁস কতটা বিশ্বাসযোগ্য
এখানে একটু সতর্ক থাকা দরকার।
এই তথ্যের উৎস এখনো শতভাগ যাচাই হয়নি। তথ্যদাতার খুব শক্ত নির্ভুলতার ইতিহাসও নেই। তাই এটাকে নিশ্চিত তথ্য না ধরে শক্তিশালী গুজব বলা বেশি ঠিক হবে।
তবে একটা বিষয় বাস্তব—যদি সত্যিই বাজেট ম্যাকবুক আনতে হয়, তাহলে Apple-কে কোথাও না কোথাও খরচ কমাতেই হবে। আর ফাঁস হওয়া পরিবর্তনগুলো সেই কৌশলের সঙ্গেই ভালোভাবে মিলে যায়।
শেষ কথা: কার জন্য হতে পারে এই ম্যাকবুক
সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, এটি পাওয়ার ইউজারদের জন্য বানানো হচ্ছে না। বরং লক্ষ্য করা হচ্ছে—
ছাত্রছাত্রী
অফিসের সাধারণ কাজের ব্যবহারকারী
হালকা ব্রাউজিং ও মিডিয়া কনজাম্পশন
আপনি যদি ভিডিও এডিটর, ডেভেলপার বা হাই-এন্ড ক্রিয়েটিভ কাজ করেন, তাহলে প্রো বা এয়ার সিরিজই ভালো পছন্দ থাকবে।
কিন্তু আপনি যদি শুধু একটি নির্ভরযোগ্য, সুন্দর দেখতে macOS ল্যাপটপ চান—কম দামে—তাহলে এই বাজেট ম্যাকবুক বাজারে এলে অনেকের জন্যই এটি হতে পারে “ভ্যালু ফর মানি” ডিভাইস।
এখন শুধু অপেক্ষা—কবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে।



