প্রযুক্তি দুনিয়ায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে Apple। জানা যাচ্ছে, ২০২৭ সালের মধ্যে তারা এমন একটি AI স্মার্ট চশমা বাজারে আনতে চায়, যেখানে কোনো স্ক্রিন থাকবে না। শুনতে অবাক লাগলেও, এটাই হতে পারে ভবিষ্যতের পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির নতুন দিক।
আমরা এতদিন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ গুঁজে থেকেছি। কিন্তু অ্যাপল এবার স্ক্রিনের বাইরে গিয়ে “প্রেক্ষাপটভিত্তিক কম্পিউটিং”-এর দিকে ঝুঁকছে। মানে, আপনি যা দেখছেন, যেখানে আছেন, যেটা করছেন—ডিভাইসটি সেটার ভিত্তিতে আপনাকে সাহায্য করবে। ভাবুন তো, সামনে একটা রেস্টুরেন্ট দেখলেন, আর চশমা নিজে থেকেই তার রিভিউ বা মেনু সম্পর্কে তথ্য জানিয়ে দিল। আলাদা করে ফোন বের করার দরকারই হলো না।
অ্যাপল এই নতুন ডিভাইসটি মূলত আইফোনের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যবহার করার জন্য ডিজাইন করছে। অর্থাৎ, এটি একা নয়—আপনার আইফোনের শক্তিকেই আরও একধাপ এগিয়ে দেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ দিকে উৎপাদন শুরু হতে পারে এবং ২০২৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে লঞ্চের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই প্রজেক্টের কোডনেম রাখা হয়েছে N50। এটি হবে একটি প্রিমিয়াম AI-চালিত পরিধেয় ডিভাইস, যেখানে থাকবে উন্নত কম্পিউটার ভিশন ও শক্তিশালী ভয়েস ইন্টারঅ্যাকশন সিস্টেম। অনেকেই ভাবতে পারেন, এটা কি তাহলে Apple Vision Pro-এর মতো কিছু? আসলে না। বরং অ্যাপল এই চশমাকে Vision Pro-এর হালকা ও ব্যবহারবান্ধব বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
Vision Pro শক্তিশালী হলেও এর আকার ও দাম অনেক ব্যবহারকারীর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই এবার অ্যাপল এমন কিছু আনতে চাইছে, যা প্রতিদিন ব্যবহার করা যায়—স্বাভাবিক চশমার মতোই হালকা ও আরামদায়ক।
সবচেয়ে বড় চমক হলো—এই স্মার্ট চশমায় কোনো ডিসপ্লে থাকবে না। অর্থাৎ, চোখের সামনে কোনো ভার্চুয়াল স্ক্রিন ভাসবে না। অ্যাপল এখানে অগমেন্টেড রিয়েলিটি ওভারলের চেয়ে অডিও ইন্টারঅ্যাকশন এবং প্রসঙ্গ বোঝার প্রযুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
চশমার ফ্রেমের ভেতরেই থাকবে স্পিকার, মাইক্রোফোন এবং ক্যামেরা। আপনি ফোন কল করতে পারবেন, Siri ব্যবহার করতে পারবেন, ছবি ও ভিডিও তুলতে পারবেন। শুধু তাই নয়, আপনি যা দেখছেন সেটার উপর ভিত্তি করে AI আপনাকে তথ্য দেবে।
ধরুন, আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। সামনে একটি ঐতিহাসিক ভবন। চশমা সেটি শনাক্ত করে আপনাকে তার ইতিহাস শোনাতে পারে। আবার দোকানে গিয়ে কোনো পণ্যের লেবেল পড়তে সমস্যা হলে, চশমা সেটি পড়ে শোনাতে পারে। এটা যেন আপনার ব্যক্তিগত সহকারী, যে সবসময় পাশে আছে।
এই স্মার্ট চশমায় থাকতে পারে দুটি ক্যামেরা সিস্টেম। একটি উচ্চ-রেজোলিউশনের ক্যামেরা ছবি ও ভিডিও ধারণের জন্য। আরেকটি বিশেষ সেন্সর থাকবে কম্পিউটার ভিশনের কাজে।
দ্বিতীয় ক্যামেরাটি আশেপাশের পরিবেশ বিশ্লেষণ করবে। বস্তু শনাক্ত করবে, দূরত্ব মাপবে, এমনকি বাস্তব সময়েই ডেটা প্রক্রিয়া করবে। ফলে আপনি যা দেখছেন, ডিভাইসটিও তা “বোঝার” চেষ্টা করবে।
এখানেই আসে প্রসঙ্গগত কম্পিউটিংয়ের শক্তি। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, আপনি গাড়ি পার্ক করেছেন। পরে যখন সেই জায়গার কাছে যাবেন, চশমা আপনাকে মনে করিয়ে দিতে পারে—“এখানেই আপনার গাড়ি পার্ক করা।” অথবা কোনো পোস্টারে লেখা তথ্য স্ক্যান করে সেটিকে ডিজিটাল নোটে রূপান্তর করতে পারে।
নেভিগেশনের ক্ষেত্রেও আসতে পারে বড় পরিবর্তন। সাধারণ ম্যাপ অ্যাপ যেখানে বলে, “২০০ মিটার পর ডানদিকে ঘুরুন,” সেখানে Siri বাস্তব দুনিয়ার ল্যান্ডমার্ক ব্যবহার করতে পারে।
ধরুন, Siri বলছে, “সামনের লাল ভবনটির পর ডানদিকে যান।” অথবা “নীল বাসটার পাশ কাটিয়ে বাঁ দিকে মোড় নিন।” এতে পথ খুঁজে নেওয়া অনেক সহজ ও স্বাভাবিক লাগবে। আপনি শুধু নির্দেশ শুনে চারপাশ দেখলেই বুঝতে পারবেন।
প্রথম দিকের প্রোটোটাইপগুলো নাকি আলাদা ব্যাটারি প্যাক এবং আইফোনের সঙ্গে তারের মাধ্যমে সংযুক্ত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংস্করণগুলোতে অ্যাপল ফ্রেমের মধ্যেই উপাদানগুলো একীভূত করছে। এতে বাহ্যিক হার্ডওয়্যারের উপর নির্ভরতা কমবে এবং ব্যবহার আরও সহজ হবে।
অ্যাপল শুরুতে কিছু পরিচিত চশমা ব্র্যান্ডের ফ্রেমে ইলেকট্রনিক্স বসানোর পরীক্ষা চালায়। পরে তারা নিজস্ব ডিজাইন তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। উচ্চমানের উপকরণ, বিভিন্ন আকার ও রঙ—সব মিলিয়ে এটি শুধু প্রযুক্তি ডিভাইস নয়, একটি ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হিসেবেও আসতে পারে।
এই প্রকল্পের আরেকটি বড় দিক হলো—অ্যাপল তাদের AI বা “অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স”কে আইফোনের বাইরে প্রসারিত করতে চায়। এতদিন আমরা স্মার্টফোনেই AI সুবিধা পেয়েছি। কিন্তু এখন সেই অভিজ্ঞতা সরাসরি পরিধানযোগ্য ডিভাইসে আসবে।

মানে, আপনি ফোন বের না করেও AI-এর সাহায্য পাবেন। অফিসে, রাস্তায়, ভ্রমণে—সারাদিনের সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে এই স্মার্ট চশমা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক চললে ২০২৭ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসতে পারে। যদিও প্রযুক্তি উন্নয়নের পথে সময়সূচি বদলানো অস্বাভাবিক নয়, তবুও অ্যাপলের প্রস্তুতি বেশ দ্রুতগতির বলেই জানা যাচ্ছে।
আমরা যখন প্রথম স্মার্টফোন হাতে পাই, তখনও ভাবিনি এটা আমাদের জীবনের এতটা অংশ হয়ে যাবে। এখন হয়তো AI স্মার্ট চশমার ক্ষেত্রেও একই গল্প শুরু হতে যাচ্ছে।
স্ক্রিনে চোখ আটকে না রেখে, চারপাশের পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত থেকে প্রযুক্তি ব্যবহার—এই ধারণাই অ্যাপলের নতুন উদ্যোগের মূল। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তাহলে ২০২৭ সালে আমরা হয়তো এমন এক ডিভাইস দেখব, যা শুধু তথ্য দেখাবে না—আমাদের দেখা, শোনা ও চলার পথকেই আরও স্মার্ট করে তুলবে।
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ হয়তো আর হাতে ধরা নয়, বরং চোখে পরা।



