ধ্রুবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় : বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যেন মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। যন্ত্রবুদ্ধি মানুষের সব গুণাবলী শিখে তার থেকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, এমন ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বজুড়ে চলছে এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তার আর সেই সাথে মানুষ উদ্বিগ্ন যে, একদিন এআই তাদের কাজ দখল করে নেবে। সম্প্রতি এক বড় প্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে, কর্মীদের মধ্যে বয়কটের ঘটনা যেখানে এক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে অফিসে আসতে নিষেধ করা হয়।
কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের গবেষণা ও এআইয়ের সীমাবদ্ধতা
কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (ISI)–এর লিঙ্গুইস্টিক রিসার্চ ইউনিটের প্রধান ড. নীলাদ্রিশেখর দাস বলেন,
“এআই যেমন শিখছে, তার সব তথ্য আসলে মানুষের থেকেই পাওয়া। তাই প্রথমেই জানতে হবে এআই কী করতে পারে না, কী সে জানে না। এটা নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন, গবেষণাধর্মী কাজ।”
ড. দাস মনে করেন, এআইয়ের বিরুদ্ধে মানবজাতির একমাত্র অস্ত্র হল মানুষের ‘ইউনিক’ গুণাবলী। যেগুলো এআই অর্জন করতে পারবে না, সেটাকেই আরও প্রখর করে গড়ে তুলতে হবে।
“মানুষের যে বৈশিষ্ট্যগুলো এখনও এআই অনুসরণ করতে পারেনি, সেগুলোকে আমরা ব্রহ্মাস্ত্র বলে ভাবতে পারি। এই ব্রহ্মাস্ত্রই আমাদের AI-র বিরুদ্ধে জয় এনে দেবে।”
এআই-এর ‘হিউম্যাননেস’ ও তার ভবিষ্যত
বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ে গবেষণা চলছে বিশেষ করে মানুষের বিশ্বাস অর্জন, কথা বলার প্রকৃতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর। এই গবেষণায় কলকাতার ISI-এর বড় ভূমিকা রয়েছে। সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন কানাডার ড. দেবস্মিতা মুখোপাধ্যায়, যিনি এআই ও রোবোটিক্স বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।
তাঁর বক্তব্যের মূল তিনটি দিক ছিল—
১. একটি এআই নির্ভর রোবট কতক্ষণ মানুষের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারে।
২. কতটা প্রাকৃতিক ও বাস্তবসম্মত ভাষায় সে কথা বলতে পারে।
৩. রোবটের সামাজিক দায়িত্ববোধ কতটা কার্যকর।
এই তিনটি দিকের সমন্বয়ে এখন এআই অ্যাপ্লিকেশন উন্নত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ‘হিউম্যাননেস’ বা মানবীয় স্পর্শের বিষয়টি।
রোবটের মধ্যে মানবীয় অনুভূতি: একটি মজার ঘটনা
ড. দেবস্মিতা একটি মজার ঘটনা শেয়ার করেন—
গবেষণার অংশ হিসেবে এক রোবট ‘সোশাল কম্প্যানিয়ন’ হিসেবে কাজ করছিল একজন অসুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে। এক পর্যায়ে রোবট হঠাৎ করেই ‘সরি’ বলল। সেই আচরণ শুনে সবাই বিস্মিত! কারণ রোবটের মধ্যে ‘দুঃখ প্রকাশ’ বা ‘মানবীয় অনুভূতি’ ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। মানুষের কথাবার্তায় সরাসরি কিছু না বলে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলা হয়, রোবটকে সেটাই শেখানো হচ্ছে।
কলকাতার বিজ্ঞানীরা বলছেন: ‘ইউনিক’ গুণাবলীই মানুষের ব্রহ্মাস্ত্র
ড. নীলাদ্রিশেখর দাসের মতে, মানুষের ‘ইউনিক’ বৈশিষ্ট্যগুলোই এআইয়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। এআই যতই অগ্রসর হোক, মানুষের অনুভূতি, সৃজনশীলতা, সংবেদনশীলতা ও জটিল চিন্তাধারা কখনোই পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারবে না। তাই এই ‘অমোঘ ব্রহ্মাস্ত্র’ তৈরির কাজই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
উপসংহার
বিশ্বজুড়ে AI নিয়ে যেমন ভয়, উদ্বেগ বাড়ছে, তেমনি বিজ্ঞানীরা সেই আতঙ্ক মোকাবেলায় মানবজীবনের অদ্বিতীয় গুণাবলীকে আরও ক্ষুরধার করে ‘ইউনিক’ করে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছেন। কলকাতার ISI-এর নেতৃত্বে এই গবেষণার কাজ এখনো চলছে। এটি কেবল প্রযুক্তি নয়, মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।


