সময় যেন আর কারও জন্য অপেক্ষা করছে না। মানুষ যত দ্রুত এগোচ্ছে, তার চেয়েও দ্রুত ছুটছে প্রযুক্তি। আর সেই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় নাম এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যাকে আমরা সহজ করে বলি AI। আজ যেটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে, কাল সেটাই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতার মাঝেই এলন মাস্ক এমন এক মন্তব্য করলেন, যা শুনে অনেকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
মাস্কের সাফ কথা—সব কিছু ঠিকঠাক চললে ২০২৬ সালের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে টপকে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, তাঁর দাবি, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই সমগ্র মানবজাতিকে সম্মিলিতভাবে ছাড়িয়ে যাবে AI।
বিশ্ব অর্থনীতির মঞ্চে মাস্কের সতর্কবার্তা
সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক বৈঠকে হাজির হয়েছিলেন এলন মাস্ক। সেখানেই তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবোটিক্স এমন গতিতে এগোচ্ছে, যা সভ্যতা, অর্থনীতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
মাস্কের বক্তব্য শুনে অনেকেই চমকে গিয়েছেন। তিনি বলেন, আগামী দশ বছরে ঠিক কী ঘটবে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। তবে AI-এর উন্নতির গতি দেখে তাঁর মনে হচ্ছে, এই বছরের শেষ নাগাদ কিংবা বড়জোর আগামী বছরের মধ্যেই এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি হয়ে যাবে, যা যে কোনও মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে মানবজাতির চেয়েও এগিয়ে AI?
এখানেই থামেননি মাস্ক। তাঁর দাবি আরও এক ধাপ এগিয়ে। তিনি বলেন, ২০৩০ বা ২০৩১ সালের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমষ্টিগতভাবে গোটা মানবজাতির চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে।
এই কথার মানে কী? সহজ করে বললে, আজ পৃথিবীতে যত মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আর চিন্তাশক্তি আছে, সব মিলিয়েও হয়তো তখন AI-এর ক্ষমতার ধারেকাছেও পৌঁছানো যাবে না। শুনতে যেন সায়েন্স ফিকশন ছবির গল্প। কিন্তু মাস্ক বলছেন, এই ভবিষ্যৎ আর খুব দূরে নেই।
গুগল কর্তার বক্তব্যও চিন্তা বাড়াচ্ছে
শুধু এলন মাস্কই নন। এই বিষয়ে একই সুরে কথা বলছেন প্রযুক্তি দুনিয়ার আরও বড় নাম। গুগল ডিপমাইন্ডের যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা এবং মুখ্য এজিআই বিজ্ঞানী শেন লেগ সম্প্রতি জানিয়েছেন, AI সিস্টেম ইতিমধ্যেই বহু ক্ষেত্রে মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে।
তার মতে, ভাষা বোঝা, কথা বলা এবং সাধারণ জ্ঞানের মতো বিষয়ে AI এখন মানুষের সমকক্ষ, কোথাও কোথাও আরও এগিয়ে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই যুক্তিপ্রয়োগ, চোখে দেখা তথ্য বিশ্লেষণ এবং ধারাবাহিকভাবে শেখার মতো দুর্বলতাগুলিও কাটিয়ে উঠবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
চাকরির বাজারে AI-এর ছায়া
এই ভবিষ্যদ্বাণীর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানের উপর। ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফটের মতো তথ্যপ্রযুক্তি জায়ান্ট সংস্থাগুলি এখন বহু কাজ AI দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে। যেখানে আগে দশজন মানুষ লাগত, সেখানে এখন একটি সফটওয়্যারই যথেষ্ট।
ফলাফল স্পষ্ট। চাকরির সংখ্যা কমছে। কর্মী ছাঁটাই বাড়ছে। অনেক তরুণ এখন ভাবছেন, যে কাজ শেখার জন্য এত বছর পড়াশোনা করলেন, সেটাই যদি AI করে ফেলে, তাহলে ভবিষ্যৎ কোথায়?
AI কি সত্যিই মানুষের শত্রু?
এই প্রশ্নটা এখন প্রায় সবার মাথায়। কেউ কেউ বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিজ্ঞানের আশীর্বাদ। আবার অনেকের চোখে AI হয়ে উঠছে বিজ্ঞানের ‘অভিশাপ’। কারণ, কাজ কমছে, অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
তবে অন্য দিকটাও আছে। যেমন ধরুন, ডাক্তারদের কাজে AI সাহায্য করছে দ্রুত রোগ শনাক্ত করতে। কৃষকদের ক্ষেত্রে AI আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে ফসল বাঁচাতে সাহায্য করছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও AI অনেকের শেখার পথ সহজ করে দিচ্ছে।
সমস্যা হচ্ছে, গতি। প্রযুক্তির গতি এত দ্রুত যে সমাজ, আইন আর মানুষের মানসিক প্রস্তুতি সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
মানুষ বনাম যন্ত্র—কে জিতবে?
এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হয়তো নেই। AI যতই বুদ্ধিমান হোক, মানুষের আবেগ, নৈতিকতা আর মূল্যবোধ এখনও যন্ত্রের বাইরে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া, বিশ্লেষণ করা কিংবা তথ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে AI যে মানুষের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এলন মাস্ক নিজেও বহুবার সতর্ক করেছেন, AI নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে তা মানবজাতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই তিনি সব সময়ই দায়িত্বশীল AI ব্যবহারের কথা বলে আসছেন।
ভবিষ্যতের দুনিয়া কেমন হতে পারে?
যদি মাস্কের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে পৃথিবীকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। কাজের ধরন বদলাবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে। হয়তো মানুষকে নতুন নতুন দক্ষতা শিখতে হবে, যেগুলো AI সহজে নকল করতে পারবে না।
একটা সময় ছিল, যখন ক্যালকুলেটর আসবে বলে মানুষ ভয় পেয়েছিল। পরে দেখা গেল, ক্যালকুলেটর মানুষকে আরও ভালোভাবে কাজ করতে সাহায্য করেছে। AI-এর ক্ষেত্রেও কি তেমনটাই হবে? নাকি সত্যিই মানুষ পিছিয়ে পড়বে?
শেষ কথা
এলন মাস্কের বক্তব্য নিঃসন্দেহে ভয় ধরানোর মতো। কিন্তু একই সঙ্গে এটি এক ধরনের সতর্কবার্তাও। AI আসছে, আর তা থামানোর উপায় নেই। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?
মানুষ আর যন্ত্রের এই দৌড়ে কে এগিয়ে থাকবে, সেটা সময়ই বলবে। তবে এতটুকু নিশ্চিত, আগামী দিনের সভ্যতা আর আগের মতো থাকবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেখানে প্রধান চরিত্র হয়েই হাজির হবে।


