অ্যান্টার্কটিকা মানেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটাই ছবি। চারদিকে শুধু বরফ। যতদূর চোখ যায়, সাদা আর সাদা। গাছ নেই, নদী নেই, প্রাণের চিহ্ন নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই ধারণাকেই পুরো উল্টে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, অ্যান্টার্কটিকার পুরু বরফের প্রায় ৪ হাজার ফুট নিচে একসময় প্রবাহিত হত নদী। বিস্তৃত এলাকায় ছিল ঘন সবুজ জঙ্গল। এই আবিষ্কার শুধু চমকপ্রদ নয়, পৃথিবীর প্রাচীন জলবায়ুর ইতিহাস বুঝতেও দারুণ গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যান্টার্কটিকা: বরফের রাজ্যের পরিচিত রূপ
পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত কুমেরু অঞ্চলই অ্যান্টার্কটিকা। এটি বিশ্বের সবচেয়ে শীতল, সবচেয়ে শুষ্ক এবং সবচেয়ে বাতাসপ্রবণ এলাকা। এখানে বরফের চাদর কোথাও কোথাও এক থেকে দুই মাইলেরও বেশি পুরু। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জমে ওঠা এই বরফের নিচে কী আছে, তা জানাই ছিল বিজ্ঞানীদের অন্যতম বড় কৌতূহল।
সাধারণভাবে মনে করা হয়, অ্যান্টার্কটিকা সবসময়ই বরফে ঢাকা ছিল। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস ঠিক তা নয়। আজ যে ভূমি আমরা বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকতে দেখি, একসময় তা ছিল প্রাণে ভরা এক ভিন্ন পৃথিবী।
ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ
এই বিস্ময়কর তথ্য সামনে এনেছেন ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তারা প্রথমে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাওয়া অত্যাধুনিক রাডার ও ভূ-তাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে অ্যান্টার্কটিকার পূর্ব অংশের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বিস্তারিত গবেষণা চালানো হয়।
বরফের নিচের ভূমির গঠন, উচ্চতা ও আকার বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, সেখানে নদীর মতো বাঁকানো পথ, উপত্যকা এবং বনভূমির স্পষ্ট চিহ্ন রয়ে গেছে। এগুলো কোনও কল্পনা নয়। এগুলো একসময় বাস্তবেই ছিল।
৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগের সবুজ অ্যান্টার্কটিকা
গবেষকদের মতে, প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে অ্যান্টার্কটিকার ওই অঞ্চল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন সেখানে বইত নদী। বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল ঘন জঙ্গল। জলবায়ু ছিল তুলনামূলক উষ্ণ ও আর্দ্র। প্রাণী ও উদ্ভিদের বসবাসের জন্য উপযোগী পরিবেশ তখন সেখানে বিদ্যমান ছিল।
এই সময় পৃথিবীর ভূখণ্ড ছিল একত্রিত। গন্ডোয়ানাল্যান্ড নামে পরিচিত বিশাল মহাদেশের অংশ ছিল অ্যান্টার্কটিকা। দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে এর ভৌগোলিক যোগাযোগ ছিল।
গন্ডোয়ানাল্যান্ড ভাঙন ও বরফে ঢেকে যাওয়ার গল্প
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গন্ডোয়ানাল্যান্ড ভেঙে যেতে শুরু করে। টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে অ্যান্টার্কটিকা ধীরে ধীরে দক্ষিণ মেরুর দিকে সরে যায়। এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে জলবায়ু।
প্রায় ২ কোটি বছর আগে থেকে সেখানে তাপমাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করে। বরফ জমা হতে থাকে নদী ও জঙ্গলের ওপর। প্রথমে পাতলা স্তর, তারপর ধীরে ধীরে সেই বরফের চাদর আরও পুরু হয়। লক্ষ লক্ষ বছরের ব্যবধানে সেই বরফ আজ পৌঁছেছে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার ফুট গভীরে।
বরফের নিচে অক্ষত থাকা প্রাচীন চিহ্ন
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, এত পুরু বরফের নিচেও নদী ও জঙ্গলের চিহ্ন সম্পূর্ণ মুছে যায়নি। বরফের চাপ ও শীতল পরিবেশ সেই ভূমির গঠনকে অনেকটাই সংরক্ষণ করে রেখেছে। ঠিক যেন সময় সেখানে থমকে গেছে।
আজ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা সেই হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর ছাপ আবার দেখতে পাচ্ছেন। নদীর খাত, পাহাড়ি ঢাল, উপত্যকার রেখা—সবই বরফের নিচে আজও স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।
পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার বরফের ইতিহাস বোঝার চাবিকাঠি
এই আবিষ্কার পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার বরফের চাদরের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন সময় থেকে বরফ জমা শুরু হয়েছিল, কত দ্রুত তা বিস্তৃত হয়েছে, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী—এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করছে এই গবেষণা।
এছাড়া ভবিষ্যতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গললে কী হতে পারে, সেই পূর্বাভাস দিতেও এই তথ্য বিজ্ঞানীদের জন্য দারুণ সহায়ক।
বৈশ্বিক জলবায়ু গবেষণায় নতুন দিগন্ত
অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে নদী ও জঙ্গলের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে পৃথিবীর জলবায়ু কখনও স্থির ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বারবার বদলেছে। আজকের উষ্ণতা বৃদ্ধি যে কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে, তার একটি ধারণাও এখান থেকে পাওয়া যায়।
এই গবেষণা শুধু অতীত জানায় না। এটি ভবিষ্যতের জন্যও সতর্কবার্তা দেয়। পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও হয়তো এমন অনেক ইতিহাস লুকিয়ে আছে, যেগুলো আমরা এখনও জানি না।
বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা আবিষ্কার
এই গবেষণার ফল প্রকাশের পর বিশ্বের নানা প্রান্তের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকায় এই খবর প্রকাশিত হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয় প্রবল কৌতূহল। বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা সবুজ অ্যান্টার্কটিকার কাহিনি যেন রূপকথার মতো শোনালেও, এটি শতভাগ বৈজ্ঞানিক সত্য।
অ্যান্টার্কটিকা আর শুধু বরফ নয়
এই আবিষ্কার আমাদের চোখে অ্যান্টার্কটিকাকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে। এটি আর শুধু বরফে ঢাকা এক নিষ্প্রাণ ভূমি নয়। বরং এটি এক সময়ের প্রাণবন্ত পৃথিবীর নিঃশব্দ সাক্ষী।
আজ বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই নদী আর জঙ্গল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী কতটা বদলাতে পারে। আর সেই বদলের গল্প জানতে বিজ্ঞানীরা প্রতিদিন নতুন নতুন দরজা খুলে দিচ্ছেন।


