মঙ্গলগ্রহে আবারও চমক, নাসার কিউরিওসিটির নজিরবিহীন ছবি
লাল গ্রহ মঙ্গল যেন এক রহস্যের ভাণ্ডার। প্রতিনিয়ত তার বুক চিরে উঠে আসছে নতুন নতুন তথ্য, যা বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ে অভিভূত করে তুলছে। সম্প্রতি নাসার রোভার ‘কিউরিওসিটি’ (Curiosity) এমন এক ছবি পাঠিয়েছে, যা পৃথিবী থেকে কোটি কিলোমিটার দূরের এই গ্রহে জলের অস্তিত্ব ও জীবনের ইতিহাস নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
প্রবালের ছাপসহ পাথর: কী দেখল কিউরিওসিটি?
গেইল ক্রেটার (Gale Crater)-এ ঘুরে বেড়ানোর সময় কিউরিওসিটির ক্যামেরায় ধরা পড়ে একটি অসাধারণ পাথর। প্রথম দেখায় অন্য সব পাথরের মতোই মনে হলেও, এই পাথরের গায়ে রয়েছে প্রবালের মতো একটি ছাপ। পৃথিবীতে যেভাবে সাগরের গভীরে প্রবাল জমে থাকে, ঠিক সেভাবে সেই ছাপটি দেখা যায় এই মঙ্গলীয় পাথরের গায়ে।
বিজ্ঞানীরা এই ছবিটি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন—এটি প্রবালের প্রকৃত ছাপ না হলেও, দেখতে প্রায় হুবহু সেরকম।
কীভাবে তৈরি হলো এই ছাপ?
প্রাথমিক বিশ্লেষণে নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই প্রবালসদৃশ ছাপের পেছনে রয়েছে জল ও খনিজের প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া। কোটি কোটি বছর আগে, যখন মঙ্গলগ্রহে প্রচুর জল ছিল, তখন সেই জলের সঙ্গে মিশে থাকা খনিজ পদার্থ পাথরের ফাঁকে ফাঁকে জমতে থাকে। পরে যখন জল শুকিয়ে যায়, তখন সেই খনিজ পাথরে জমাট বাঁধে এবং প্রবালের মতো গঠন তৈরি করে।
এই ছাপ তৈরি হওয়ার সময়কাল বোঝায়, পাথরটি একসময় জলের নিচে ছিল, এবং সেই সময় মঙ্গলে একটি সক্রিয় জলচক্র ও পরিবেশ ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল।
সম্ভাব্য প্রাণের ইতিহাসের ইঙ্গিত?
এমন আবিষ্কার কেবল geological (ভূতাত্ত্বিক) দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং জীবনের সম্ভাব্য ইতিহাস সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন তোলে। কারণ, প্রবাল বা সেরকম গঠন সাধারণত জলজ পরিবেশেই গড়ে ওঠে এবং অনেক সময় জীবাশ্ম বা মাইক্রো-জীবনের উপস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে।
যদিও এখনো বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত নন যে এটি প্রাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তবুও এমন ছাপ মঙ্গলের ইতিহাসে জীবনের সম্ভাবনার জোরালো প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
গেইল ক্রেটার: মঙ্গলের ইতিহাসের সাক্ষী
গেইল ক্রেটার বহু আগে এক বৃহৎ হ্রদ ছিল বলে মনে করা হয়। কিউরিওসিটি ২০১২ সাল থেকে এই এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক গঠন নিয়ে নাসাকে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করছে।
এই ক্রেটারের পাথর, মাটি ও খনিজের নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আগেই ধারণা করেছিলেন যে এখানে একসময় জল প্রবাহিত ছিল। এবার প্রবালসদৃশ গঠনের এই ছাপ সেই ধারনাকেই আরও দৃঢ় করছে।
নাসার প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
নাসার গবেষকরা বলছেন, “এটি নিছক একটি ছবি নয়—এটি প্রাচীন জলবায়ু ও ভূতাত্ত্বিক গতিপ্রকৃতির জোরালো প্রমাণ। আমরা আরও গভীরভাবে এই পাথর ও আশেপাশের এলাকার নমুনা বিশ্লেষণ করব, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় এই ছাপের প্রকৃতি ও উৎস।”
মার্স স্যাম্পল রিটার্ন মিশনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই ধরনের নমুনা পৃথিবীতে এনে বিশ্লেষণ করার পরিকল্পনা চলছে। এতে হয়তো মঙ্গলে প্রাচীন জীবন বা প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
পৃথিবী থেকে মঙ্গল: জীবনের সন্ধানে আরও এক ধাপ
মঙ্গলে জলের অস্তিত্ব আগেই প্রমাণিত হয়েছে। এবার প্রবালসদৃশ গঠন আবিষ্কার মঙ্গলে জীবনের সম্ভাবনা আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল। যদিও এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না, তথাপি এমন আবিষ্কার মানব সভ্যতার মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।


