আকাশের দিকে তাকিয়ে কখনও কি ভেবেছ, আমরা আসলে কত ছোট? মহাবিশ্বে প্রতিদিন কত ঘটনা ঘটে, অথচ তার খুব সামান্যই আমাদের চোখে ধরা পড়ে। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু বিরল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা ঘটে, যা পুরো পৃথিবীর মানুষের কৌতূহল একসঙ্গে জাগিয়ে তোলে। ঠিক তেমনই এক অসাধারণ মহাজাগতিক বিস্ময়ের সাক্ষী হতে চলেছে বিশ্ব ১৭ ফেব্রুয়ারি। এই দিন দেখা যাবে এক বিশেষ ধরনের সূর্যগ্রহণ, যাকে বলা হয় বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ বা ‘রিং অফ ফায়ার’।
চলো, সহজ করে পুরো ঘটনাটা বুঝে নেওয়া যাক—কী এই বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ, কেন এটাকে রিং অফ ফায়ার বলা হয়, আর কোথা থেকে এই দৃশ্য সবচেয়ে ভালো দেখা যাবে।
আমরা জানি, সূর্যগ্রহণ তখনই ঘটে যখন চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এসে দাঁড়ায়। তখন চাঁদ সূর্যের আলো আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ঢেকে দেয়। কিন্তু সব সূর্যগ্রহণ একরকম নয়। কখনও পুরো সূর্য ঢাকা পড়ে, আবার কখনও সূর্যের চারপাশে আগুনের মতো উজ্জ্বল বলয় দেখা যায়।
১৭ ফেব্রুয়ারির এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ সূর্যগ্রহণ নয়। এটি হবে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। এদিন চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে অবস্থান করলেও পৃথিবী থেকে তুলনামূলকভাবে অনেকটা দূরে থাকবে। ফলে আকাশে চাঁদকে কিছুটা ছোট দেখাবে। এই কারণে চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারবে না।
ফলাফল কী হবে জানো? সূর্যের মাঝখানটা অন্ধকার হয়ে যাবে, কিন্তু চারদিকে একটি উজ্জ্বল আলোর বলয় তৈরি হবে। দেখতে যেন আগুনের আংটির মতো! তাই এই বিরল দৃশ্যকে বলা হয় ‘রিং অফ ফায়ার’।
এই বিশেষ বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণে সূর্যের প্রায় ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত অংশ ঢাকা পড়তে পারে। ভাবতে পারছো? দিনের বেলা হঠাৎ করে সূর্য প্রায় পুরোটা অদৃশ্য হয়ে যাবে, কিন্তু একদম চারপাশে থাকবে জ্বলজ্বলে আলোর বৃত্ত। দৃশ্যটা সত্যিই অবিশ্বাস্য সুন্দর।
এই বলয় বা রিং অফ ফায়ার দৃশ্য স্থায়ী হবে দুই মিনিটেরও বেশি সময়। যদিও সময়টা খুব বেশি নয়, কিন্তু যারা সরাসরি দেখার সুযোগ পাবেন, তাদের জন্য এটি হবে জীবনের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
অনেকেই ভাবছেন, ভারত থেকে কি এই বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে? উত্তরটা একটু হতাশাজনক। যখন মহাকাশে এই ঘটনা ঘটবে, তখন ভারতে থাকবে রাতের অন্ধকার। অর্থাৎ সূর্য তখন দিগন্তের নিচে থাকবে। তাই ভারত থেকে এই বিরল রিং অফ ফায়ার দেখা সম্ভব হবে না।
শুধু ভারতই নয়, বিশ্বের বড় একটি অংশ এই দৃশ্য থেকে বঞ্চিত থাকবে। কারণ সূর্যগ্রহণ সব জায়গা থেকে একসঙ্গে দেখা যায় না। এটি নির্ভর করে পৃথিবীর কোন অংশ তখন সূর্যের মুখোমুখি রয়েছে তার ওপর।
এই বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ মূলত দক্ষিণ গোলার্ধে দৃশ্যমান হবে। সবচেয়ে পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গভাবে দেখা যাবে অ্যান্টার্কটিকা থেকে।
শুনতে একটু অদ্ভুত লাগতে পারে, কারণ অ্যান্টার্কটিকায় তো সাধারণ মানুষের বসবাস নেই। সেখানে কেবল বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা বিভিন্ন গবেষণা স্টেশনে কাজ করেন। তারাই এই বিরল দৃশ্য সরাসরি দেখার সুযোগ পাবেন।
এছাড়া আংশিকভাবে এই সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে। যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবোয়ে, তানজানিয়া এবং জাম্বিয়া থেকে আংশিক দৃশ্য উপভোগ করা যাবে।
দক্ষিণ আমেরিকার দিকেও কিছু অংশ থেকে এই ঘটনা দেখা সম্ভব। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা এবং চিলি-এর কিছু অঞ্চল থেকে আংশিক বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।
ভাবো তো, দিনের আলো হঠাৎ একটু একটু করে কমে আসছে। পাখিরা বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে, চারপাশে এক অদ্ভুত গাঢ় পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তারপর হঠাৎ সূর্যের মাঝখানটা ঢেকে গিয়ে চারদিকে আগুনের মতো উজ্জ্বল বলয়! এমন দৃশ্য তো রোজ দেখা যায় না।
বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছেও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময় সূর্যের বহিরাবরণ বা করোনার কিছু বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করা যায়। যদিও সম্পূর্ণ সূর্যগ্রহণে করোনা বেশি স্পষ্ট দেখা যায়, তবুও বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
যারা এই দৃশ্য দেখতে পারবেন, তাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। খালি চোখে সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো বিপজ্জনক। এতে চোখের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই বিশেষ সূর্যগ্রহণ চশমা বা সুরক্ষিত ফিল্টার ব্যবহার করা জরুরি।
অনেকে ভুল করে সাধারণ সানগ্লাস ব্যবহার করেন। কিন্তু তা মোটেও নিরাপদ নয়। সঠিক সুরক্ষা ছাড়া সূর্যগ্রহণ দেখা উচিত নয়—এটা মনে রাখা খুবই জরুরি।
এ ধরনের বিরল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কত বিশাল এক মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র অংশ। সূর্য, চাঁদ আর পৃথিবীর নিখুঁত অবস্থান বদলালেই আকাশে তৈরি হয় এমন অসাধারণ দৃশ্য।
এই বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ হয়তো বিশ্বের সবার চোখে ধরা দেবে না। তবুও প্রযুক্তির যুগে আমরা লাইভ সম্প্রচার বা ভিডিওর মাধ্যমে এই মহাজাগতিক বিস্ময় উপভোগ করতে পারি। আর প্রতিবার এমন ঘটনা ঘটলেই আমাদের কৌতূহল একটু করে বাড়ে—মহাবিশ্ব নিয়ে, জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে, আর নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে।
১৭ ফেব্রুয়ারির রিং অফ ফায়ার হয়তো সবার জন্য দৃশ্যমান হবে না, কিন্তু এটি আবারও প্রমাণ করবে—আকাশে এখনও অনেক অজানা বিস্ময় লুকিয়ে আছে। আর সেই বিস্ময়ের অপেক্ষায় আমরা সবাই আছি, চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে।


