ডিপফেক ভিডিও, ভুয়ো ছবি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ বাড়ছিল। হঠাৎ কারও মুখ বসিয়ে দেওয়া ভিডিও, নকল অডিও, কিংবা সম্পূর্ণ ভুয়ো খবর ছড়িয়ে পড়ছে মুহূর্তের মধ্যে।
এই পরিস্থিতিতে এবার বড় পদক্ষেপ নিল কেন্দ্রীয় সরকার। নয়া সংশোধিত তথ্যপ্রযুক্তি আইন অনুযায়ী, আদালত বা পুলিশ নির্দেশ দিলে সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে সর্বোচ্চ ৩ ঘণ্টার মধ্যে আপত্তিকর ডিপফেক বা বেআইনি কনটেন্ট সরাতে হবে।
আগে এই কাজের জন্য সোশাল মিডিয়া সংস্থাগুলির হাতে সময় থাকত ৩৬ ঘণ্টা। নতুন আইনে সেই সময়সীমা অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশজুড়ে কার্যকর হচ্ছে এই আইন। এর ফলে মেটা, ইউটিউব, এক্সের মতো বড় সোশাল মিডিয়া সংস্থাগুলির উপর নজরদারি আরও কড়া হচ্ছে।
ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই কাউকে ফাঁসানো যায়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব—কেউই বাদ পড়ছেন না। কখনও ভুয়ো ভিডিও দিয়ে সম্মানহানি, কখনও প্রতারণা, আবার কখনও শিশু নিগ্রহের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই কারণেই সরকার চাইছে, ক্ষতিকর কনটেন্ট যেন যত দ্রুত সম্ভব অনলাইন থেকে সরানো যায়। কয়েক ঘণ্টা দেরি হলেও ততক্ষণে ভিডিও বা পোস্ট লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। নতুন আইন সেই ঝুঁকি কমাতেই আনা হয়েছে।
২০২১ সালেই তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করেছিল কেন্দ্র। সেই সময়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টে স্পষ্টভাবে জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়, যাতে ব্যবহারকারী বুঝতে পারেন এটি আসল নাকি কৃত্রিমভাবে তৈরি।
তবে সব ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। শিক্ষামূলক কনটেন্ট বা শিল্পকর্ম যদি এআই দিয়ে তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে তাকে ‘সিন্থেটিকালি জেনারেটেড ইনফরমেশন’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু প্রতারণা, যৌন হেনস্থা, শিশু নিগ্রহ বা ভুয়ো তথ্য ছড়ানোর উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার করলে তা সরাসরি বেআইনি বলে গণ্য হবে।
নয়া আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সময়সীমা। সরকার, আদালত বা পুলিশ যদি কোনও সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে নির্দিষ্ট কনটেন্ট সরানোর নির্দেশ দেয়, তাহলে ৩ ঘণ্টার মধ্যেই সেই নির্দেশ কার্যকর করতে হবে।
আগে যেখানে ৩৬ ঘণ্টা সময় পাওয়া যেত, সেখানে এখন এই কঠোর সময়সীমা সোশাল মিডিয়া সংস্থাগুলির দায়িত্ব অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে। জরুরি ও গুরুতর ক্ষেত্রে কিছু কনটেন্ট মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যেই সরানোর নির্দেশও দেওয়া হতে পারে।
শুধু কনটেন্ট সরানোই নয়, ব্যবহারকারীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনও অভিযোগ এলে সোশাল মিডিয়া সংস্থাকে সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে তার সমাধান করতে হবে।
আগে এই সময়সীমা ছিল ১৫ দিন। জরুরি অভিযোগের ক্ষেত্রে আগে যেখানে ৭২ ঘণ্টা সময় দেওয়া হত, সেখানে এখন তা কমিয়ে ৩৬ ঘণ্টা করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার আশা করতে পারেন।
নয়া আইনে সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতি ৩ মাস অন্তর ব্যবহারকারীদের সতর্কবার্তা পাঠাতে হবে। এই বার্তায় স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, কী ধরনের কনটেন্ট পোস্ট করা আইনবিরুদ্ধ।
প্রতারণামূলক পোস্ট, যৌন হেনস্থা, শিশু নিগ্রহ বা ভুয়ো তথ্য ছড়ালে কী ধরনের শাস্তি হতে পারে, সেটাও মনে করিয়ে দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড, স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া, এমনকি জেল ও জরিমানার মতো আইনি ব্যবস্থা।
এই নয়া আইনের ফলে বড় সোশাল মিডিয়া সংস্থাগুলির উপর সরাসরি চাপ বাড়ছে। কেবল কনটেন্ট হোস্ট করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। কী পোস্ট হচ্ছে, কী ছড়াচ্ছে, কোথায় সমস্যা—সবকিছুর উপর নজর রাখতে হবে আরও সক্রিয়ভাবে।
ডিপফেক ভিডিও বা ভুয়ো কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত করার জন্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা জোরদার করাও এখন সংস্থাগুলির জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে উঠছে।
এই আইন আসলে সাধারণ মানুষের সুরক্ষার জন্যই। কেউ যদি হঠাৎ দেখেন, তাঁর নাম বা মুখ ব্যবহার করে ভুয়ো ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকছে। দেরি না করে কনটেন্ট সরানো গেলে মানসিক ক্ষতি, সামাজিক অপমান বা আর্থিক প্রতারণা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এক কথায়, নয়া তথ্যপ্রযুক্তি আইন ডিপফেক ও ভুয়ো কনটেন্টের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন। সোশাল মিডিয়ার দুনিয়ায় দায়িত্ব ও জবাবদিহি যে এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়, সেটাই স্পষ্ট করে দিল এই আইন।


