আকাশে বিস্ফোরণ, তবুও স্বাভাবিক জীবন? দুবাই থেকে প্রবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা

ইরানের আত্মঘাতী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর উপসাগরজুড়ে যখন উত্তেজনা তুঙ্গে, তখন দুবাইয়ে থাকা প্রবাসীরা একেবারে ভিন্ন সুরে কথা বলছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোলরা কটাক্ষ ছুঁড়ছে, কিন্তু সেখানে বসবাসকারী অনেকেই বলছেন—“দুবাই এখনো নিরাপদ, জীবন স্বাভাবিকভাবেই চলছে।”

এই ঘটনাগুলো শুরু হয় উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার পর। দুবাই, যাকে অনেকেই বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ শহর বলে মনে করেন, হঠাৎ করেই খবরের শিরোনামে উঠে আসে।

দুবাইয়ে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ব্রিটিশ নাগরিক বাস করেন। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রথমে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকেই আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন, কেঁপে উঠেছে ভবন।

এসেক্স থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী ডেমি ক্যালডার, যিনি তিন বছর আগে দুবাইয়ে স্থায়ী হয়েছেন, বলেন পরিস্থিতি যতটা বাইরে থেকে ভয়াবহ মনে হচ্ছে, ভেতরে ততটা নয়। তার ভাষায়, অনেকে ঈর্ষা থেকেই ট্রোল করছেন।

তিনি জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার স্পষ্ট করেছে—আকাশে যে বিস্ফোরণ দেখা গেছে, সেগুলো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে বাধা দেওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ফল। অর্থাৎ হামলার বেশিরভাগই মাঝ আকাশে প্রতিহত হয়েছে।

শনিবার রাতে তিনি জুমেইরাহ ভিলেজ সার্কেলে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দা থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের আলো দেখতে পান। তবু তিনি এতটা আতঙ্কিত হননি যে স্বাভাবিক জীবন থামিয়ে দেন। এমনকি মেইদান রেসকোর্সেও গিয়েছিলেন, যেখানে আবারও আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত হতে দেখেছেন।

ভাবুন তো, আপনার পরিবার দূরে বসে ভয়ে কাঁপছে, আর আপনি বাইরে গিয়ে রেস দেখছেন। তার পরিবারও ঠিক এমনটাই অনুভব করেছে। কিন্তু তিনি বলছেন, বাস্তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল।

হামলার দ্বিতীয় দিনে তিনি জুমেইরাহর সার্কেল মলে কেনাকাটা করতে যান। হঠাৎ সবার ফোনে একসঙ্গে সতর্কবার্তা আসে। ফোন কাঁপতে থাকে, বড় অক্ষরে সতর্কতা ভেসে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে মল খালি করে দেওয়া হয়। সবাইকে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়।

পরদিন সকালেই সুপারমার্কেটে ভিড় বাড়তে থাকে। মানুষজন খাবার মজুত করতে শুরু করে। একে একে লাইন লম্বা হয়। ঠিক যেমন বড় কোনো ঝড়ের আগে আমরা বাজারে হুড়োহুড়ি দেখি—এখানেও তেমনই দৃশ্য।

এরপর থেকে বেশিরভাগ অফিস কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করতে বলেছে। রাস্তায় যানজট কমে গেছে। সাধারণত যেসব সড়কে দীর্ঘ যানজট থাকে, সেগুলো প্রায় ফাঁকা।

লন্ডন থেকে সদ্য দুবাইয়ে আসা চার্টার্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট ড. জেন হ্যালসাল পুরো পরিস্থিতিকে “অবাস্তব অথচ গভীর মানবিক অভিজ্ঞতা” বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত হতে দেখা এমন কিছু নয় যা আপনি প্রতিদিনের জীবনে আশা করেন—বিশেষ করে এমন একটি শহরে, যাকে বিশ্বের নিরাপদ শহরগুলোর একটি বলা হয়।

তার মতে, মানুষের মধ্যে একধরনের অদৃশ্য উদ্বেগ কাজ করছে। সবাই আকাশের দিকে তাকাচ্ছে, অচেনা শব্দে চমকে উঠছে, বারবার ফোন চেক করছে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি লক্ষ্য করেছেন এক অসাধারণ সংহতি। প্রতিবেশীরা একে অপরের খোঁজ নিচ্ছেন, সহায়তার প্রস্তাব দিচ্ছেন।

তিনি মনে করেন, সরকারের নিয়মিত আপডেট এবং দৃশ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মানুষের ভরসা বাড়িয়েছে। তার ব্যক্তিগত অনুভূতিও স্পষ্ট—তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করছেন।

হামলার ফলে পাম জুমেইরাহর পাঁচতারকা ফেয়ারমন্ট হোটেলে আগুন লাগে এবং চারজন আহত হন। এছাড়া দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, Burj Al Arab এবং জেবেল আলি বন্দরের আশপাশে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ার খবর পাওয়া গেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন Burj Khalifa সাময়িকভাবে খালি করা হয় সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে।

তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ হামলাই সফলভাবে প্রতিহত করেছে।

হামলার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের ঝড় ওঠে। কেউ লিখেছে, “ইনফ্লুয়েন্সাররা তো নিরাপত্তার জন্যই দুবাই যায়, এখন কী হলো?” আবার কেউ বলেছেন, “দুবাই আর ফ্লেক্স করার জায়গা নয়।”

তবে অনেক পরিচিত মুখ পাল্টা অবস্থান নিয়েছেন। উদ্যোক্তা Duncan Bannatyne স্পষ্টভাবে বলেন, দুবাই এখনো নিরাপদ এবং স্থায়ী বাসিন্দাদের কেউ শহর ছাড়ার কথা ভাবছেন না। তার মতে, যারা সাহায্য চাইছেন, তারা মূলত পর্যটক বা ব্যবসায়িক সফরে এসে আটকে পড়া মানুষ।

এদিকে দুবাইয়ের নেতৃত্বও জনসাধারণকে আশ্বস্ত করতে সরাসরি মাঠে নেমেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট Mohammed bin Zayed Al Nahyan এবং দুবাইয়ের ক্রাউন প্রিন্স Hamdan bin Mohammed Al Maktoum দুবাই মলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সময় কাটান। কফি পান করেন, শিশুদের সঙ্গে ছবি তোলেন। এই দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

অনেকেই বলছেন, নেতাদের এই উপস্থিতি মানুষের মনে ভরসা জুগিয়েছে—“নেতৃত্ব আমাদের পাশে আছে।”

হ্যাঁ, ভয় আছে। অনিশ্চয়তাও আছে। মাঝরাতে বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভেঙে যাওয়া স্বাভাবিক নয়। কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো—দুবাই পুরোপুরি থেমে যায়নি।

শপিং মল খুলেছে, অফিস চলছে (যদিও অনেকেই বাসা থেকে কাজ করছেন), মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছে।

দুবাই বহু সংস্কৃতি, বহু ধর্ম আর বহু দেশের মানুষের মিলনস্থল। এই বৈচিত্র্যই এখন শক্তিতে পরিণত হয়েছে। সংকটের সময় মানুষ বুঝতে পারছে, নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তিতে নয়—সমাজের ঐক্যেও নিহিত।

সব মিলিয়ে, ইরানের ড্রোন হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র সংকট দুবাইকে নাড়া দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু শহরটি এখনো নিজের স্বাভাবিক ছন্দ ধরে রাখার চেষ্টা করছে। প্রবাসীরা বলছেন, পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হলেও জীবন থেমে নেই।

শেষ কথা একটাই—ভয় বাস্তব, অনিশ্চয়তাও সত্য। কিন্তু সংহতি, প্রস্তুতি আর নেতৃত্বের উপস্থিতি অনেকের মনে সাহস জোগাচ্ছে। আর সেই সাহসই হয়তো এই শহরকে আবার স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে আনবে।

লেটেস্ট আপডেট

হরমুজ প্রণালী বন্ধ! ইউরোপে গ্যাসের দাম ৪৫% লাফ—বিশ্ব অর্থনীতি কি নতুন সংকটে?

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছাতেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে শুরু...

অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে কত খরচ হচ্ছে আমেরিকার?

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের কালো ছায়া ঘনিয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের...

বর্ষীয়ান অভিনেতা বৈদ্যনাথ সাহার শেষকৃত্য সম্পন্ন

বর্ষীয়ান অভিনেতা বৈদ্যনাথ সাহা (৭৩) আর নেই। মঙ্গলবার (৩...

১১ জনের মৃত্যুর সেই মাঠেই আইপিএল ফাইনাল! চিন্নাস্বামীর ভাগ্য বদলের গল্প

বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম আবারও শিরোনামে। এক বছর আগে...

‘সেই রাতে আমরা এক হয়েছিলাম’ : বিজয়-রশ্মিকার স্বপ্নের সঙ্গীত ও বিয়ের অদেখা মুহূর্ত!

দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি বিজয় দেবরাকোন্ডা ও...

বাছাই সংবাদ

হরমুজ প্রণালী বন্ধ! ইউরোপে গ্যাসের দাম ৪৫% লাফ—বিশ্ব অর্থনীতি কি নতুন সংকটে?

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছাতেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে শুরু...

অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে কত খরচ হচ্ছে আমেরিকার?

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের কালো ছায়া ঘনিয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের...

বর্ষীয়ান অভিনেতা বৈদ্যনাথ সাহার শেষকৃত্য সম্পন্ন

বর্ষীয়ান অভিনেতা বৈদ্যনাথ সাহা (৭৩) আর নেই। মঙ্গলবার (৩...

১১ জনের মৃত্যুর সেই মাঠেই আইপিএল ফাইনাল! চিন্নাস্বামীর ভাগ্য বদলের গল্প

বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম আবারও শিরোনামে। এক বছর আগে...

‘সেই রাতে আমরা এক হয়েছিলাম’ : বিজয়-রশ্মিকার স্বপ্নের সঙ্গীত ও বিয়ের অদেখা মুহূর্ত!

দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি বিজয় দেবরাকোন্ডা ও...

ইউনূস নিজেকে ‘ভিভিআইপি’ ঘোষণা! গেজেট কোথায় গেল?

বাংলাদেশের সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস...

দুদক চেয়ারম্যানের হঠাৎ পদত্যাগ! কী ঘটছে দুর্নীতি দমন কমিশনে?

দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক এর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ...

মাটি বিক্রির অভিযোগে ধরা! চৌগাছায় পুকুর খননে বড় শাস্তি

যশোরের চৌগাছায় অনুমতি ছাড়া পুকুর খনন করার অভিযোগে মিলন...

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি