যখন আমরা চাঁদের উল্টোপিঠ নিয়ে আলোচনা করি, তখন সেটা কল্পনার রহস্যময়তার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যশোর-নওয়াপাড়া সড়কের অবস্থা দেখে মনে হয়, বাস্তবের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি চাঁদের সেই অজানা গর্তময় প্রান্তর। এই যশোর-নওয়াপাড়া সড়ক যেন বাংলাদেশের সড়কব্যবস্থার এক জীবন্ত ব্যঙ্গচিত্র—একটি পথ নয়, যেন গর্তের সংকলন!
যশোর-নওয়াপাড়া সড়ক: উন্নয়নের নামে অবহেলার চিহ্ন
এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি যশোর জেলার একটি অন্যতম প্রধান যোগাযোগ রুট, যা খুলনার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। যশোর-খুলনা মহাসড়কের একটি মূল অংশ হিসেবে এই রাস্তাটি প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী, ব্যবসায়ী ও পরিবহন চালকদের চলাচলের রুট। কিন্তু বছরের পর বছর এই রাস্তাটি সংস্কারের অভাবে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
রাস্তার পিচ উঠে গিয়েছে, তৈরি হয়েছে ১-৩ ফুট গভীর গর্ত, যেগুলো বর্ষাকালে ছোট পুকুরে রূপ নেয়। যাত্রীদের দুর্ভোগের সীমা থাকে না।
যানবাহনের মৃত্যুপুরী: যশোর-নওয়াপাড়ার গর্তে গুমরে ওঠে ইঞ্জিনের কান্না
প্রতিদিন অসংখ্য বাস, ট্রাক, সিএনজি ও বাইক এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু এই যাত্রাটা আদতে একরকম রাশিয়ান রুলেট!
- ট্রাক চালকদের ভাষায়: “এই রাস্তায় ট্রাক চালানো মানে নিজের কপালের পরীক্ষা!”
- বাসচালকরা বলছেন: “ট্রিপ নয়, এটা যাত্রীদের ‘জিম্বাবুয়ে সফর’ – কে বাঁচে, কে পড়ে যায়, কে উঠে দাঁড়ায়, বলা যায় না।”
- সিএনজি ড্রাইভাররা কাঁপতে কাঁপতে বলেন: “এখন একেকটা গর্তে পড়ে মনে হয়, গাড়িটা না গিয়ে আমিই ডুবে যাচ্ছি।”
এখানে চাকা ফাটে, অ্যাক্সেল ভাঙে, যাত্রীরা কোমরের ব্যথা নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় যায়। অথচ দেখার কেউ নেই।
যাত্রীদের অভিজ্ঞতা: গর্ত নয়, যেন মৃত্যু ফাঁদে যাত্রা
যাত্রীদের অনেকেই প্রথম যশোর-নওয়াপাড়া রোডে উঠলে “মৌনব্রত” গ্রহণ করেন—হঠাৎ জোরে কিছু বললে দাঁত পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে!
- গর্তে পড়েই হেলমেট মাথা থেকে সরে গিয়ে গাছে লেগে যায়।
- পকেটের কয়েন বাজতে বাজতে ‘জান’ বাঁচানোর সুর তোলে।
- এক মহিলা যাত্রী তো বলেই ফেলেছেন, “এই রাস্তায় পাঁচবার আসার পর আমি আর বসে নামতে পারি না, হামাগুড়ি দিয়ে নামি।”
এই অভিজ্ঞতাগুলো হয়ত মজার মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে এগুলো ভয়ংকর এবং অবহেলার এক কালচিত্র।
স্থানীয়দের ব্যঙ্গ ও বেদনা: “গর্তের দেশে স্বাগত”
এ সড়কের পাশে থাকা চায়ের দোকানগুলো যেন একেকটা জ্যান্ত দর্শক গ্যালারি। তারা রাস্তার প্রতিটি ‘ব্যাকফ্লিপ’, প্রতিটি হোঁচট দেখে হাততালি দেয়।
- “আরেকটা সিএনজি পড়ল ভাই, আজকের তৃতীয়টা!”
- “এই গর্তটা কালকে নতুন হয়েছে, ইঞ্জিনিয়ারের তরফ থেকে ‘উপহার’ বোধহয়!”
এইসব ব্যঙ্গই প্রমাণ করে, নির্বিকার সরকারের প্রতি স্থানীয়দের ক্ষোভ কতটা গভীর।
বর্ষা মানেই ভয়াবহ: গর্তের মধ্যে জলাধার, সড়ক যেন সুইমিংপুল
বর্ষাকালে গর্তগুলো ঢেকে যায় পানি দিয়ে, তখন বোঝার উপায় থাকে না কোনটা রাস্তা আর কোনটা গর্ত। এক মোটরসাইকেল আরোহী বলেন, “গর্ত দেখে বাইক ঘোরাতে যাই, কিন্তু পানি দেখে ভেবে নিই, পুকুর—বাইপাস করি। কিছুক্ষণ পর দেখি, ওইটাতেই রাস্তা ছিল!”
বৃষ্টি মানেই একটা নতুন বিপদ, একটা নতুন অভিজ্ঞতা, আর একটা নতুন ব্যথা।
স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা: “সংস্কার হবে, কবে হবে?”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বারবার ভেস্তে যাচ্ছে। “সংস্কার কাজ শীঘ্রই শুরু হবে”, এই আশ্বাস এখন আর কাউকে সান্ত্বনা দেয় না।
একজন চালক কৌতুক করে বলেন,
“জন্ম থেকে শুনে আসছি, রাস্তাটা হবে! এখন ছেলেকে বলি, হয়ত তোর ছেলের আমলে হবে!”
এই অবস্থা পরিচালনার চূড়ান্ত ব্যর্থতা। জনগণের করের টাকায় তৈরি হওয়া রাস্তা, কিন্তু ব্যবহারকারীদের যেন মৃত্যুফাঁদে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
পরিণাম: অর্থনীতি ও মানবস্বাস্থ্যে ক্ষয়ক্ষতি
এই সড়কের করুণ অবস্থার কারণে:
- ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। পণ্য পরিবহনে সময় দ্বিগুণ, খরচ দ্বিগুণ।
- রোগী পরিবহনে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে, ফলে জীবন রক্ষা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
- গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেড়ে গেছে তিনগুণ পর্যন্ত।
- মনস্তাত্ত্বিক চাপ এমন হয়েছে যে কেউ কেউ এই রুট পুরোপুরি এড়িয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ব্যবসার গতিও ক্ষতিগ্রস্ত।
একটিমাত্র দাবি: রাস্তার সংস্কার চাই, এখনই চাই
এই রোড কেবল যশোর বা নওয়াপাড়ার মানুষের জন্য নয়, এটি একটি জাতীয় যোগাযোগপথ। এর উন্নয়ন মানে শুধু গর্ত ভরাট নয়, এটি মানুষের জীবন, ব্যবসা, অর্থনীতি এবং যাতায়াতের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অধিকার।
আমরা দাবি জানাচ্ছি—
- এই সড়কে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারকাজ শুরু করা হোক।
- প্রতিদিনের যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।
- একটি স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ টিম গঠন করে সড়ক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা হোক।
–লেখক: সাজেদ রহমানের ফেসবুক থেকে নেয়া।


