বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে যখন আলোচনা, বিশ্লেষণ আর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ চলছে, ঠিক তখনই সরব হয়েছেন বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক মন্তব্য করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। বিশেষ করে বিএনপির জয়ের পর তাঁর বক্তব্য নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে।
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল অনুযায়ী, Bangladesh Nationalist Party (বিএনপি) এককভাবে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে। প্রাথমিক ঘোষণায় দেখা যায়, দলটি ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে।
অন্যদিকে Bangladesh Jamaat-e-Islami পেয়েছে ৬৮টি আসন। এছাড়া এনসিপি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি, গণ অধিকার পরিষদ ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি–বিজেপি ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি, খেলাফত মজলিস ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়লাভ করেছে।
এই ফলাফল রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অনেকেই এটিকে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলছেন।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর তসলিমা নাসরিন স্পষ্ট ভাষায় জানান, বিএনপির জয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে উদ্বেগ, হতাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা।
তিনি দাবি করেন, গত দেড় বছরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শন করেছে। বড় বড় সমাবেশ করেছে, সহিংসতা চালিয়েছে এবং সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন। বাড়িঘরে আগুন দেওয়া, নির্যাতনের মতো ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তসলিমা নাসরিন শুধু নির্বাচনের ফল নিয়েই কথা বলেননি। তিনি দেশের সামাজিক পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নারী প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছে, কর্মজীবী নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে এবং নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা করা হয়েছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যদি রাষ্ট্রীয় নীতিতে রক্ষণশীলতা প্রাধান্য পায়, তবে নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে। তাঁর ভাষায়, কোনও রাজনৈতিক শক্তি যদি নারীদের পোশাক বা জীবনধারা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তবে সেটি গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ সরাসরি জামায়াতে ইসলামিকে ক্ষমতায় বসায়নি—এটিকে তিনি আপাতত ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন।
তসলিমা নাসরিনের মতে, এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব Bangladesh Nationalist Party-এর। তিনি কয়েকটি স্পষ্ট দাবি তুলে ধরেছেন, যা তাঁর মতে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
প্রথমত, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র যদি সব নাগরিককে সমানভাবে না দেখে, তাহলে বিভাজন আরও বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক—যারা ভিন্নমত পোষণ করেন, তাদের কণ্ঠ রোধ করা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।
তৃতীয়ত, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়—হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি স্পষ্ট বলেন, রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়া।
তসলিমা নাসরিন শিক্ষা ব্যবস্থার দিকেও নজর দিয়েছেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা জোরদারের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, আধুনিক শিক্ষা ছাড়া একটি দেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না।
তিনি সর্বজনীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথাও বলেন। ধনী-গরিব বৈষম্য কমাতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
গণতন্ত্রের স্বার্থে তিনি Awami League-এর ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পক্ষে মত দেন। তাঁর মতে, কোনও বড় রাজনৈতিক দলকে পুরোপুরি রাজনীতির বাইরে ঠেলে দিলে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
তিনি নির্বাসিত নেতাদের দেশে ফিরে রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, জিহাদি-সমর্থিত শক্তিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে রাখা দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তসলিমা নাসরিন মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ইতিহাসের প্রতীকগুলো ধ্বংস বা অবহেলা করা মানে জাতীয় স্মৃতিকে দুর্বল করা।
তিনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি পুনর্গঠনের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর দৃষ্টিতে, এসব স্থান কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়—এগুলো দেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের অংশ।
তিনি ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এমনটাই তাঁর মত।
সবচেয়ে আলোচিত দাবিগুলোর একটি হলো চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে মুক্তি দেওয়া। তসলিমা নাসরিন মনে করেন, যাদের অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করা হয়েছে—তাদের মুক্তি দিতে হবে। শুধু রাজনৈতিক কর্মী নয়, শিল্পী, লেখক ও সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থান তাঁর।
এই দাবিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ এটিকে মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান বলছেন, কেউ আবার রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখছেন।
এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের একটি মোড়। নতুন সরকার কীভাবে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলা করবে—তা সময়ই বলে দেবে।
তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য স্পষ্ট, তিনি একটি উদার, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবাধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখতে চান। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচিত সরকার তাঁর মতো সমালোচকদের উদ্বেগ কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে।
রাজনীতির মঞ্চে জয়-পরাজয় আসে যায়। কিন্তু নাগরিকের অধিকার, স্বাধীনতা আর নিরাপত্তা—এই প্রশ্নগুলোই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে এনে দিয়েছে।


