বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে একাত্তরের গণহত্যা, যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং আটকে পড়া নাগরিকদের প্রত্যাবাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো আবারও সামনে এসেছে। পাকিস্তান দাবি করছে, এসব বিষয় অতীতে সমাধান হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি।এ খবর বিবিসি বাংলা অনলাইনের।
সম্প্রতি ঢাকায় দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে এসে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান যে, একাত্তরের ইস্যুগুলো ১৯৭৪ এবং ২০০২ সালে দুই দফায় সমাধান হয়েছে। তবে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন।
রবিবার ঢাকার হোটেল সোনারগাঁওয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
মোহাম্মদ ইসহাক দার বলেন: “অমীমাংসিত বিষয়গুলো দুইবার নিষ্পত্তি করা হয়েছে—প্রথমবার ১৯৭৪ সালে এবং দ্বিতীয়বার ২০০০ সালের শুরুতে, যখন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। আমাদের এখন অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত।”
কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন স্পষ্টভাবে জানান: “আমি একমত নই। যদি সত্যিই সমাধান হয়ে যেত, তাহলে আজকের এই আলোচনার প্রয়োজন হতো না।”
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনটি প্রধান ইস্যুতে জোর দেওয়া হয়েছে: একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা, যুদ্ধ-পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টন ও বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের প্রত্যাবাসন।
তৌহিদ হোসেন বলেন: “বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা চাই পাকিস্তান গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করুক এবং মাফ চাই। আমরা আমাদের প্রাপ্য সম্পদের সঠিক হিসাব চাই, এবং যারা বাংলাদেশে আটকে আছেন, তাদের প্রত্যাবাসনের সমাধান চাই।”
বৈঠকে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের বাজারে সাফটা চুক্তির আওতায় টেক্সটাইল, ওষুধ, কৃষি প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে প্রবেশাধিকারের দাবি জানানো হয়েছে।
যদিও একাত্তরের গণহত্যা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো অগ্রগতি হয়নি, তবুও দুই দেশ একমত হয়েছে যে এই বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে।
মোহাম্মদ ইসহাক দার জানিয়েছেন, পাকিস্তান মনে করে ১৯৭৪ সালে এবং ২০০২ সালে বিষয়টি সমাধান হয়েছে।১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় সফরে এসে “তওবা” প্রকাশ করেন এবং একাত্তরের ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন।২০০২ সালের মুশাররফের ক্ষমা প্রার্থনা
২০০২ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ বাংলাদেশ সফরে এসে পুনরায় দুঃখপ্রকাশ করেন। পাকিস্তানের দাবি, এই দুইবারেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।
যদিও পাকিস্তান দাবি করছে সমস্যাগুলো সমাধান হয়েছে, ইতিহাস অন্য কথা বলছে।বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে একাধিক বৈঠক করলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় সম্পদের বণ্টনে কোনো সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি।বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনও জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানের অযৌক্তিক অবস্থানের কারণে আলোচনাগুলো ভেস্তে যায়।বিশ্লেষকেরা মনে করেন, একাত্তরের গণহত্যার দায় ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন: “একাত্তরে গণহত্যার দায় পাকিস্তানিদের স্বীকার করতে হবে। আকারে-ইঙ্গিতে দুঃখপ্রকাশ যথেষ্ট নয়, আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে।”
সম্প্রতি বাংলাদেশ ৪.৩২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে পাকিস্তানের কাছে, যা একাত্তরের যুদ্ধ ও স্বাধীনতার আগে আটকে থাকা সম্পদের প্রাপ্য হিসেবে ধরা হয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের পর বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিন বলেছিলেন: “অতীতের অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করে পাকিস্তানের সঙ্গে কল্যাণমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই।”
বৈঠকে মোট একটি চুক্তি এবং পাঁচটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।দুই দেশের সরকারি ও কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা বাতিল করা হয়েছে।বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কমিটি গঠন, ফরেন সার্ভিস একাডেমির মধ্যে সহযোগিতা, রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়, বাংলাদেশ বিআইআইএসএস ও পাকিস্তান আইএসএসআই-এর মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা ও দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতিবিনিময় কর্মসূচি।
বাংলাদেশের দাবি, পাকিস্তানকে একাত্তরের গণহত্যার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করতে হবে এবং বকেয়া সম্পদের সঠিক বণ্টন করতে হবে। অপরদিকে পাকিস্তান অতীত ভুলে ভবিষ্যতের দিকে এগোনোর আহ্বান জানাচ্ছে।
যদিও আলোচনায় বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি, দুই দেশই সম্মত হয়েছে যে এসব অমীমাংসিত ইস্যুর সমাধান হতে হবে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমেই।


