বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে আসছে, তা হলো—সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এখন কোথায় থাকছেন? তিনি কি এখনও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আছেন? আর নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কোথায় উঠবেন? পুরো বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে কৌতূহল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকাল। সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় বাসভবনের বাসিন্দাও।
পাঁচ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ ছাড়েন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস শপথ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে। তখন সরকারি সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাকে তাঁর সরকারি বাসভবন নির্ধারণ করা হয়।
সাধারণত প্রধানমন্ত্রী গণভবনে বসবাস করেন। তবে গণভবন হামলা ও ভাঙচুরের কারণে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় বিকল্প হিসেবে যমুনাকে বেছে নেয় সরকার।
বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়েছে। তবুও অধ্যাপক ইউনূস এখনও যমুনায় অবস্থান করছেন। জানা গেছে, তিনি আর এক সপ্তাহের মধ্যেই যমুনা ছেড়ে গুলশানের নিজ বাসভবনে ফিরে যাবেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, গুলশানের বাসায় কিছু সংস্কার কাজ চলায় সাময়িকভাবে যমুনায় অবস্থান করছেন তিনি।
এ মুহূর্তে তিনি স্ত্রী ও মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে যমুনায় আছেন এবং ব্যক্তিগত কাজ সেখান থেকেই পরিচালনা করছেন।
নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ওঠার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরাসরি ওঠার আগে কিছু সংস্কার কাজ হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পুলিশের রমনা বিভাগ প্রধানমন্ত্রী ও যমুনা এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবনটিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। আনুমানিক এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে পুরো প্রস্তুতি শেষ করতে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রীর চাহিদা অনুযায়ী কিছু কাঠামোগত ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন আনা হবে। ভবনটি খালি পাওয়ার পর এক মাসের মধ্যেই প্রস্তুত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ অধ্যাপক ইউনূস যমুনা ছাড়ার পরই শুরু হবে পূর্ণমাত্রার সংস্কার কাজ।
হ্যাঁ, আপাতত তিনি দেশেই থাকছেন। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে জাপানে একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। অনুষ্ঠান শেষে তিনি আবার দেশে ফিরবেন বলে জানা গেছে।
এই সফরটি তাঁর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকালেই নির্ধারিত হয়েছিল। তিনি জাপানের সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে পাঁচ দিনব্যাপী একটি সম্মেলনে অংশ নেবেন। সেখানে তিনি বক্তব্য দেবেন, বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নেবেন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক আলোচনা করবেন।
তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, জাপান সফরই হবে নতুন পর্বে তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। আপাতত অন্য কোনো দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই।
সরকারি দায়িত্ব শেষ হলেও অধ্যাপক ইউনূস থেমে থাকছেন না। খুব শিগগিরই তিনি ইউনূস সেন্টারে অফিস শুরু করবেন। আগামী সপ্তাহ থেকেই সেখানে নিয়মিত কাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আবারও মনোযোগ দিচ্ছেন তাঁর বহুল আলোচিত থ্রি জিরো কনসেপ্টের দিকে। এই ধারণার মূল তিনটি লক্ষ্য হলো—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ।
বিশ্বব্যাপী সামাজিক ব্যবসা ও টেকসই উন্নয়নের যে দর্শন তিনি দীর্ঘদিন ধরে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, সেটিকে আরও বিস্তৃত করতে চান তিনি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণও জমা রয়েছে তাঁর কাছে। তবে সবগুলোতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় বাসভবন পরিবর্তন সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। যমুনা এখন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এটি ছিল প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু। এখন নতুন প্রধানমন্ত্রীর আবাস হিসেবে এটি আবারও আলোচনায়।
একদিকে অধ্যাপক ইউনূস তাঁর ব্যক্তিগত ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রমে ফিরে যাচ্ছেন, অন্যদিকে নতুন সরকার প্রশাসনিক কার্যক্রম গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত। ফলে যমুনাকে ঘিরে চলছে সংস্কার, নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস।
সবকিছু ঠিক থাকলে খুব শিগগিরই অধ্যাপক ইউনূস যমুনা ছেড়ে নিজ বাসায় ফিরবেন। এরপর শুরু হবে নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি। নিরাপত্তা জোরদার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ হলে যমুনায় উঠবেন তারেক রহমান।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের কাজ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত হচ্ছেন অধ্যাপক ইউনূস। জাপান সফরের মধ্য দিয়ে শুরু হবে তাঁর নতুন অধ্যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে—রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক কাঠামোও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যমুনা এখন শুধু একটি ভবন নয়, এটি ক্ষমতার পরিবর্তন ও নতুন সূচনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে—কে কখন কোথায় উঠছেন এবং কীভাবে নতুন সরকার তার পূর্ণ কার্যক্রম শুরু করছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাই নজর এখন যমুনা কেন্দ্রিক এই পরিবর্তনের দিকেই।



