বিজয়ের মাসে জাতি হারাল মুক্তিযুদ্ধের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বীর উত্তম এ কে খন্দকার আর নেই। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই বীর সেনানী শনিবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর জানিয়েছে, বার্ধক্যজনিত কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
এই চলে যাওয়া শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। যাঁর কাঁধে ছিল যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের ভার, যাঁর সিদ্ধান্তে আকাশে ভেসেছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন।
মুক্তিযুদ্ধে এ কে খন্দকারের ভূমিকা: নেতৃত্ব আর সাহসের গল্প
এ কে খন্দকার ছিলেন মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান, অর্থাৎ ডেপুটি চিফ অব স্টাফ। সহজ ভাষায় বললে, যুদ্ধের সময় পুরো বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে তাঁর ভূমিকা ছিল সরাসরি। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি কেবল নির্দেশ দেননি, নিজে সামনে থেকে পথ দেখিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর দ্বিতীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেই আরামদায়ক ও সম্মানজনক অবস্থান ছেড়ে তিনি ঝুঁকি নিয়েছিলেন। দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে সবকিছু ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। এটা কল্পনা করলেই বোঝা যায়, কী পরিমাণ সাহস আর দেশপ্রেম থাকলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
১৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক মুহূর্তে উপস্থিত এক সাক্ষী
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকার রেসকোর্স ময়দান। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এ কে খন্দকার। ইতিহাসের পাতায় যে ছবিগুলো আমরা দেখি, সেখানে তাঁর উপস্থিতি আজও আমাদের গর্বিত করে।
এই মুহূর্ত শুধু একটি যুদ্ধের সমাপ্তি ছিল না। এটি ছিল একটি জাতির জন্ম। আর সেই জন্মের সাক্ষী ছিলেন তিনি।
স্বাধীনতার পর প্রথম বিমানবাহিনী প্রধান
স্বাধীনতার পর দেশ তখন ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, সীমিত সম্পদ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ঠিক সেই সময় এ কে খন্দকারকে নিযুক্ত করা হয় বাংলাদেশের প্রথম বিমানবাহিনী প্রধান হিসেবে।
১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। নতুন করে গড়ে ওঠে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, কাঠামো আর শৃঙ্খলা। বলা যায়, আজকের আধুনিক বিমানবাহিনীর ভিত্তি তখনই স্থাপন হয়েছিল।
বীর উত্তম এ কে খন্দকারের জন্ম ও শিক্ষা জীবন
এ কে খন্দকার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩০ সালে। বাবার কর্মস্থল রংপুরে তাঁর জন্ম হলেও তাঁর আদি নিবাস পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার পুরান ভারেঙ্গা গ্রামে। গ্রামের সেই মাটির টান তাঁর জীবনে সব সময়ই ছিল।
তিনি ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পড়াশোনায় ছিলেন মনোযোগী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। ১৯৫২ সালে তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, এই তরুণ একদিন বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় জায়গা করে নেবেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ডেপুটি চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব
গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে তাঁকে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যুদ্ধকালীন সময়ে এই পদ মানে ছিল পরিকল্পনা, সমন্বয় আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা।
তিনি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বুঝতেন। তাই তাঁর নেতৃত্ব ছিল বাস্তবভিত্তিক, সাহসী আর সময়োপযোগী। সহযোদ্ধাদের কাছে তিনি ছিলেন ভরসার নাম।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের জন্য ১৯৭৩ সালে তাঁকে দেওয়া হয় ‘বীর উত্তম’ খেতাব। এটি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক সম্মান।
এর অনেক বছর পরে, ২০১১ সালে তিনি লাভ করেন স্বাধীনতা পদক। এই দুটি সম্মান যেন তাঁর জীবনের সংগ্রাম আর ত্যাগের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
তিনি সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখার আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল সক্রিয় ও স্পষ্ট।
রাজনীতিতে এ কে খন্দকার: সেনানী থেকে মন্ত্রী
সামরিক জীবনের পর এ কে খন্দকার রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি প্রথম মন্ত্রী হন এইচ এম এরশাদের সরকারের সময়। পরে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী। কখনো আপস করেননি নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে। অনেক সময় তাঁর বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে, বিতর্কও হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো নিজের অবস্থান লুকাননি।
‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
এ কে খন্দকারের লেখা বই ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি আলোচিত গ্রন্থ। এই বইতে তিনি যুদ্ধের ভেতরের পরিকল্পনা আর বাইরের রাজনৈতিক বাস্তবতা দুটোই তুলে ধরেছেন।
এই বই পড়লে মনে হয়, যেন ইতিহাসের ক্লাস নয়, বরং একজন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর মুখ থেকে গল্প শোনা হচ্ছে। গবেষক, শিক্ষার্থী আর নতুন প্রজন্মের জন্য বইটি আজও গুরুত্বপূর্ণ।
জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি
এ কে খন্দকারের মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারাল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দক্ষ সামরিক নেতা ও অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর জীবন ছিল দায়িত্ব আর দেশপ্রেমের উদাহরণ।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর কাজ, তাঁর সিদ্ধান্ত আর তাঁর লেখা ইতিহাস হয়ে থাকবে। নতুন প্রজন্ম যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা জানবে, তখন এ কে খন্দকার নামটি বারবার ফিরে আসবে।
এই বিজয়ের মাসে তাঁর বিদায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কত ত্যাগের বিনিময়ে এসেছে। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর আত্মা শান্তিতে থাকুক।


