মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক বি-১ বোমারু বিমান বহর ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স (RAF) ঘাঁটির দিকে রওনা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বৃহৎ আক্রমণের ইঙ্গিত বহন করছে, যাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট “বিগ ওয়ান” বলে উল্লেখ করেছেন।
এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
মার্কিন বিমান বাহিনীর অত্যাধুনিক বি-১ বোমারু বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডাইস এয়ার ফোর্স বেস থেকে যুক্তরাজ্যের গ্লুচেস্টারশায়ারের RAF ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। এই বোমারু বিমানগুলো একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বহন করতে সক্ষম।
বি-১ বোমারু বিমান একটি দীর্ঘপাল্লার কৌশলগত বোমারু বিমান, যা এক মিশনে প্রায় ৩৪ টন পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে। উন্নত প্রযুক্তির কারণে এটি শত্রু রাডারের চোখ এড়িয়ে দূরপাল্লার আক্রমণ চালাতে সক্ষম।
সামরিক সূত্র বলছে, ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর এসব বিমানের সঙ্গে আরও কিছু কৌশলগত বোমারু বিমান যুক্ত হতে পারে, যার মধ্যে বি-২ স্টেলথ বোমারু এবং বি-৫২ স্ট্র্যাটেজিক বোমারও থাকতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এক সপ্তাহ আগে ইরানের বিরুদ্ধে “অপারেশন এপিক ফিউরি” নামে যৌথ হামলা চালায়। সেই অভিযানের পর থেকেই নতুন বড় আকারের হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের আক্রমণ এখনও শুরুই হয়নি। তার ভাষায়, “আমরা এখনও তাদের ওপর শক্তভাবে আঘাত করিনি। বড় ঢেউ এখনো আসেনি।”
এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, কারণ এটি সম্ভাব্য বৃহৎ সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এখন যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।
প্রতিরক্ষা সূত্র অনুযায়ী, ভবিষ্যতে আরও যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন, অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং নিয়মিত বোমারু মিশন পরিচালনা করা হবে।
প্রথমদিকে যুক্তরাজ্য এই ধরনের হামলার অনুমতি দিতে কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও পরে তারা “প্রতিরক্ষামূলক হামলা” চালানোর জন্য মার্কিন বাহিনীকে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
ইরানের রাজধানী তেহরান সম্প্রতি বড় ধরনের বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যাপক বোমা হামলা চালানো হয় বলে জানা গেছে।
বিস্ফোরণের সময় তীব্র শব্দ, ধোঁয়ার কুণ্ডলী এবং আগুনের গোলা দেখা যায়। শহরের বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের তীব্রতায় বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভিডিও ফুটেজে তেহরানের বিখ্যাত আজাদি টাওয়ারকে কেন্দ্র করে বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা গেছে।
বি-১ বোমারু বিমানকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘপাল্লার বোমারু বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরা হয়। এটি একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণ নির্ভুল ও অনির্ভুল অস্ত্র দ্রুত সরবরাহ করতে পারে।
মার্কিন বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এই বিমান পৃথিবীর যেকোনো স্থানে খুব অল্প সময়ের মধ্যে হামলা চালাতে সক্ষম। এর উন্নত রাডার প্রযুক্তি চলমান লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে এবং ভূখণ্ড অনুসরণ করে উড়ে শত্রু প্রতিরক্ষা এড়াতে পারে।
এ কারণে আধুনিক যুদ্ধে এই বিমানকে অত্যন্ত কার্যকর কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন হামলায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো “মাদার অব অল বোম্বস” বা MOAB।
এই বোমাটি প্রায় ১০ টন ওজনের এবং বিস্ফোরণের সময় বিশাল এলাকা ধ্বংস করতে সক্ষম। বিস্ফোরণের ফলে প্রায় এক হাজার ফুট ব্যাসের গর্ত তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
এই অস্ত্রটি এর আগে আফগানিস্তানে ব্যবহার করা হয়েছিল। যদিও এখন পর্যন্ত ইরানে এটি ব্যবহার করা হয়নি, তবে সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে এই অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্ভাব্য বড় আক্রমণে শুধু বিমান বাহিনী নয়, মার্কিন নৌবাহিনীও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিমানবাহী রণতরী এবং ডেস্ট্রয়ার থেকে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হতে পারে। একই সঙ্গে সাবমেরিন থেকেও হামলা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ধরনের সমন্বিত আক্রমণ হলে সেটি হবে ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানগুলোর একটি।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হবে না, যদি না তারা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা শুরু করেছে, যা সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতেও পড়েছে। ব্রিটিশ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছুটা মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও তীব্র হলে এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শুরু হলে তেলের দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়া এবং নতুন শরণার্থী সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি এখন বিশ্বের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামরিক প্রস্তুতি, কূটনৈতিক চাপ এবং সম্ভাব্য বড় আক্রমণের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের দিকে।



