নদীর নাম বেত্রবতী। নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কালিদাসের মেঘদূতের মতো কাব্যময় স্মৃতি, যদিও এই নদী সেই প্রাচীন কবিতার নদী নয়। তবু বেত্রবতীর বুক জুড়ে রয়েছে আরেক বিরহের গল্প—যেখানে নদীর ধারে বসে থাকে না যক্ষ, কিন্তু বসে থাকে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকা মানুষেরা, যারা তাদের নদীকে হারাতে দেখেছে।
প্রবাহ থামলে নদীর মৃত্যু
জীবন যেমন গতি চায়, নদীরও প্রাণ তার প্রবাহে। একসময় এই বেত্রবতী ছিল প্রমত্তা, উজান থেকে নেমে আসা স্রোতে ভেসে আসত সম্ভাবনা আর স্বপ্ন। কিন্তু মানুষের অবিবেচক কর্মকাণ্ড নদীর গতিপথ রুদ্ধ করেছে বারবার—অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত বাঁধ, পলি জমে যাওয়া মুখ আর চাষাবাদের নামে পানি শোষণ—সব মিলিয়ে আজকের বেত্রবতী যেন এক দীর্ঘশ্বাসে ভরা ইতিহাস।
নাম বদল, আত্মা নয়
পুরোনো দলিল, মানচিত্রে নদীর নাম বেত্রবতী, আর মানুষের মুখে মুখে এখন বেতনা নদী। নাম বদলে গেলেও নদীর অতীত বদলায়নি। এই নদীর বুকে জড়িয়ে আছে শত বছরের জনপদ, কৃষির স্বপ্ন আর মানুষের বাঁচার লড়াই।
প্রবাহপথ: সীমান্তের নদী
বেত্রবতীর জন্ম ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদে। সেখান থেকে সে প্রবাহিত হয়ে চলে যায় ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাগদা থানায়, আবার ফিরে আসে বাংলাদেশে, যশোরের শার্শা উপজেলার শিকারপুর সীমান্ত ছুঁয়ে। মানচিত্রে আজ এই নদী এক ক্ষীণ রেখা, অথচ একসময় ছিল গর্জনরত জলরাশি।
নদীর পাড়ের জীবনের চিত্র
বর্ষায় বেত্রবতী ফিরে পায় ক্ষণিকের প্রাণ। নদীর পাড়ে ছড়িয়ে থাকে সবুজ ধানের খেত, পাট গাছ দাঁড়িয়ে থাকে বুক চিতিয়ে। ছোট ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে কাদা মাখা জলে সাঁতার কাটে, কোথাও মাছ ধরার জাল। শুষ্ক মৌসুমে নদীর বুক শুকিয়ে যায়, আগাছার দখলে চলে যায় সেই বিস্তৃত তীর।
অতীতের বাণিজ্য কেন্দ্র
এই নদী ঘিরেই একসময় গড়ে উঠেছিল বড় বড় হাট-বাজার। বেত্রবতীর স্রোতে ভেসে আসত পণ্য, নৌকা ভেড়াত পাড়ে। কৃষক, ব্যবসায়ী আর যাত্রী—সবার জীবন চলত এই নদীকে ঘিরে। সেই বাণিজ্যের গল্প এখন কেবল স্মৃতি আর বুড়োদের মুখের কথা।
ঔপনিবেশিক দলিল: প্রমাণিত প্রমত্তা
মেজর রেনেলের মানচিত্র বেত্রবতীর প্রমত্তার সাক্ষী। এককালে নদীটি ছিল প্রশস্ত, প্রবাহ ছিল অদম্য। আজ কোথাও দখল, কোথাও মৃতপ্রায়, তবুও ইতিহাস বলে—বেত্রবতী ছিল সাহস, ভরসা আর সম্ভাবনার প্রতীক।
দখলদারিত্ব আর অনিয়মিত খনন
বছরের পর বছর বেত্রবতী ভুগেছে দখলদারদের থাবায়। নদীর বুক ভরাট হয়েছে পলি আর বর্জ্যে, পরিকল্পনা ছাড়া বাঁধ নির্মাণ নদীর স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ করেছে। নদীটি হারিয়েছে তার প্রাণশক্তি, বাঁচাতে গেলে চাই সমন্বিত উদ্যোগ আর সচেতনতা।
সংস্কৃতি আর লোককথায় বেত্রবতী
বেত্রবতীর গল্প কেবল মানচিত্রে নয়, লোককথা, গান আর উপকথায় মিশে গেছে এই নদী। কোনো গ্রামের বারোমাস্যা গানে, কোনো চারণ কবির পদে বেত্রবতী আজও বয়ে চলে মানুষের বুকের ভেতর দিয়ে।
আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ
আজকের দিনে বেত্রবতী জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর কৃষি নির্ভর চাপে বিপর্যস্ত। কখনো বন্যায় ডুবে যায় চারপাশ, আবার শুকনো মৌসুমে নদী থাকে প্রায় মৃতপ্রায়। আমাদের দায়িত্ব নদীটিকে পুনরুজ্জীবিত করা।
সংরক্ষণই সমাধান
বেত্রবতীকে বাঁচাতে চাই দখলমুক্তি, নিয়মিত খনন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ আর স্থানীয় মানুষের সচেতন অংশগ্রহণ। নদী বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, মানুষের জীবন বাঁচবে, আর বেঁচে থাকবে এক অনন্য ইতিহাস।
শেষ কথায় বেত্রবতী
বেত্রবতী শুধু জল নয়, এক প্রজন্মের স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার গল্প। যশোর থেকে ঝিনাইদহ, বাগদা থেকে শার্শা—এই নদীর ধার ঘেঁষে কত জনপদ আজো তাকিয়ে আছে নদীর দিকে। আমরা যদি সচেতন না হই, হারিয়ে যাবে এক নদী, আর তার সাথে হারিয়ে যাবে অজস্র জীবনের সম্ভাবনা।


