বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর থেকেই দেশের পররাষ্ট্রনীতির দিকটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক—সবার মধ্যেই কৌতূহল রয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ক্ষমতায় এলে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, সেই বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন দলটির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা এবং তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু জটিলতা থাকলেও দুই দেশের সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলার অনেক সুযোগ রয়েছে। পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং সমান স্বার্থের ভিত্তিতে একটি সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে। শুধু কূটনৈতিক পর্যায়েই নয়, এই টানাপোড়েনের প্রভাব দেখা গেছে ক্রীড়া অঙ্গনেও। দুই দেশের জনগণের আবেগের জায়গাতেও বিষয়টি প্রভাব ফেলেছে।
এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে কি সেই সম্পর্ক আবার আগের মতো স্বাভাবিক হবে? এই প্রশ্নের জবাবে মাহদী আমিন বলেন, সমস্যা থাকলেও তা সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ হিসেবেই দেখা উচিত। তিনি মনে করেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ যত বাড়বে, ততই ভুল বোঝাবুঝি কমবে।
তার কথায়, একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দুই দেশই সমানভাবে লাভবান হবে। একপক্ষের সুবিধা নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে উঠলে সেটি দীর্ঘস্থায়ী হবে।
বিএনপির দৃষ্টিতে ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। তাই সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রশ্নই ওঠে না। বরং দলটি চায় এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে আস্থা থাকবে এবং উভয় দেশের প্রয়োজন ও স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মাহদী আমিন বলেন, সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই জরুরি। দুই দেশের মধ্যে যদি পারস্পরিক সম্মান থাকে, তাহলে যেকোনো সমস্যা সহজেই সমাধান করা সম্ভব। তিনি বিশ্বাস করেন, আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা যায়।
তার মতে, একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী সম্পর্ক মানে শুধু রাজনীতি নয়, বরং অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে থাকা বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে।
শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, বিএনপি ক্ষমতায় এলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায় বলে জানিয়েছেন মাহদী আমিন। তার মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা—সবক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ বাড়লে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। নতুন বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময়ও বাড়বে, যা একটি দেশের পরিচয়কে আরও সমৃদ্ধ করে।
তার মতে, পররাষ্ট্রনীতি এমন হওয়া উচিত যেখানে দেশের স্বার্থ আগে থাকবে, কিন্তু অন্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও বজায় থাকবে।
আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নির্বাচন কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এই প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, এই সিদ্ধান্ত জনগণের। তার দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে নানা অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতির বিষয়গুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সেই কারণেই জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে।
তার মতে, দেশের মানুষই শেষ কথা বলেছে এবং তাদের মতামতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনই প্রধান বিষয় হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। ভারতের পাশাপাশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করে মাহদী আমিন বলেন, দলটি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণায় বিশ্বাস করে। এর মূল কথা হলো—ধর্ম, বর্ণ বা পরিচয় যাই হোক না কেন, প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সমান।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিএনপি মনে করে দেশের প্রতিটি মানুষ সমান নিরাপত্তা, সমান স্বাধীনতা এবং সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার রাখে। কোনো নাগরিক যেন নিজেকে বিচ্ছিন্ন বা অনিরাপদ মনে না করে, সেটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, একটি দেশের শক্তি তার মানুষের ঐক্যে। সেখানে ভেদাভেদ নয়, বরং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার মনোভাবই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্পর্কের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। তাই নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব কেমন কূটনৈতিক পথ বেছে নেবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মাহদী আমিন মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব।
তার মতে, সম্পর্ক যদি আস্থার উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে যেকোনো সংকট সহজেই কাটিয়ে ওঠা যায়। আর যদি আস্থার ঘাটতি থাকে, তাহলে ছোট সমস্যাও বড় হয়ে ওঠে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হলে শুধু রাজনৈতিক লাভই নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে। সীমান্ত বাণিজ্য, শিল্প সহযোগিতা এবং পর্যটনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
মাহদী আমিন বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়লে উভয় দেশের মানুষই উপকৃত হবে। কৃষি, শিল্প ও প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রেও যৌথ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
এছাড়া সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। গান, সিনেমা, সাহিত্য—সবকিছুতেই মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এসব সম্পর্ক আরও গভীর হলে মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতিতেও নতুন ভাবনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে এগোবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দলটির নেতারা পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং সমান স্বার্থের কথা বলছেন।
মাহদী আমিনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তারা সম্পর্ক ভাঙতে নয়, বরং নতুনভাবে গড়ে তুলতে চান। এমন একটি সম্পর্ক যেখানে দুই দেশই লাভবান হবে, এবং যেখানে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
ভবিষ্যতে কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে এগোতে চায়। আর সেই পথচলাই হয়তো নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।


