ডিম ছোড়া শুনলেই অনেকের মাথায় প্রথমে আসে অশোভন আচরণ বা রাগের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু রাজনীতি আর সমাজের ইতিহাসে এই ডিম ছোড়ার মানে অনেক গভীর। এটা শুধু রাগ দেখানো নয়। অনেক সময় এটা হয় বার্তা দেওয়ার সবচেয়ে সহজ আর চোখে পড়ার মতো উপায়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা বাড়ায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে—ডিম ছোড়াকে কেন বিশ্ব রাজনীতিতে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
এই লেখা পড়লে বিষয়টা একদম পরিষ্কার হয়ে যাবে। গল্পের মতো করে বুঝতে পারবেন, কেন শত শত বছর ধরে মানুষ ডিমকেই বেছে নিয়েছে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে।
ডিম ছোড়া আসলে এক ধরনের প্রতীকী প্রতিবাদ। এখানে উদ্দেশ্য কাউকে মারাত্মকভাবে আঘাত করা নয়। বরং সামাজিকভাবে অপমান করা। মানে বলা, “আমি তোমার কাজ মেনে নিচ্ছি না।”
ভাবুন তো, কেউ মাইকে লম্বা ভাষণ দিচ্ছে। ভিড়ের একজন হঠাৎ ডিম ছুড়ে মারল। মুহূর্তেই সব ক্যামেরা, সব চোখ ওই মানুষটার দিকে। কথার চেয়ে এই কাজটা অনেক বেশি জোরালো হয়ে ওঠে।
এই কারণেই বিশ্বজুড়ে রাজনীতিতে ডিম ছোড়াকে অহিংস কিন্তু তীব্র প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হয়।
অনেকে ভাবেন এটা আধুনিক রাজনীতির ব্যাপার। আসলে তা নয়। ডিম বা পচনশীল খাবার ছুড়ে প্রতিবাদের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো।
প্রাচীন রোমের কথাই ধরুন। ৬৩ খ্রিস্টাব্দে কঠোর শাসনের কারণে রোমান সম্রাট ভেসপাসিয়ানের ওপর শালগম ছুড়ে মেরেছিল ক্ষুব্ধ জনতা। তখনও মানুষ জানত, খাবার ছোড়া মানে ঘৃণা আর অসম্মান প্রকাশ।
মধ্যযুগে কারাবন্দিদের শাস্তি দিতেও ডিম ছোড়ার চল ছিল। কাঠের ফ্রেমে বেঁধে রেখে জনগণ পচা ডিম ছুড়ত। এটা ছিল প্রকাশ্য লজ্জা দেওয়ার পদ্ধতি।
এক সময় এই প্রতিবাদের ভাষা ঢুকে পড়ে থিয়েটারে। এলিজাবেথীয় যুগে ইংল্যান্ডে অভিনেতার অভিনয় ভালো না লাগলে দর্শকরা পচা ডিম ছুড়ে মারত। আজকের দিনে যেমন কেউ খারাপ সিনেমা দেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল করে, তখন ডিম ছোড়াই ছিল সেই রিভিউ।
ইংরেজ লেখিকা জর্জ এলিয়টের উপন্যাস ‘মিডলমার্চ’-এও এই দৃশ্য আছে। নির্বাচনী ভাষণের সময় মি. ব্রুকের দিকে ডিম ছোড়া হয়। লেখায় বোঝা যায়, এটা শুধু হামলা নয়, বরং পরিকল্পিত অপমান।
ডিম ছোড়ার ইতিহাসে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এখানে কেউ বিশেষ ছাড় পায়নি। রাজা হোক বা সাধারণ নেতা, সবাই এই প্রতিবাদের মুখে পড়েছেন।
২০২২ সালে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস এবং কুইন ক্যামিলার দিকে ডিম ছোড়া হয়। ডিমগুলো গায়ে লাগেনি, কিন্তু বার্তাটা পৌঁছে গেছে ঠিকই।
মার্গারেট থ্যাচার, জন মেজর, ডেভিড ক্যামেরন, এড মিলিব্যান্ড, নাইজেল ফারাজ—ব্রিটিশ রাজনীতির বড় বড় নামের তালিকায় ডিম হামলার গল্প আছে।
জন প্রেসকটের ঘটনা তো আরও বিখ্যাত। ডিম ছোড়ার পর তিনিও রাগ সামলাতে না পেরে পাল্টা ঘুষি মেরেছিলেন। এতে বোঝা যায়, ডিম যত ছোট জিনিসই হোক, অপমানটা কতটা তীব্র হতে পারে।
এই সংস্কৃতি শুধু যুক্তরাজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনের সময় আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার ডিম হামলার শিকার হন।
ইউক্রেনে ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের দিকে ডিম ছোড়ার পর সবাই ভেবেছিল ইট মারা হয়েছে। এতটাই নাটকীয় ছিল ঘটনাটা।
অস্ট্রেলিয়ায় প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের মাথায় ডিম লেগেছিল। ফ্রান্সে মেরিন লে পেনও রক্ষা পান দেহরক্ষীর কারণে।
সব জায়গায় গল্প এক। ডিম ছোড়া মানে, “আমরা তোমার রাজনীতিতে খুশি নই।”
ডিমই শেষ কথা নয়। পৃথিবীর নানা দেশে প্রতিবাদের ভাষা আরও রঙিন।
২০০৮ সালে ইরাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের দিকে জুতা ছুড়ে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলেন সাংবাদিক মুনতাধার আল জাইদি। জুতা ছোড়া মধ্যপ্রাচ্যে চরম অপমানের প্রতীক।
গ্রিসে দই ছোড়া হয়, যাকে বলা হয় ইয়াউরটামা। রাশিয়া ও ইউক্রেনে নুডলস ঝুলিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়। এসবই আসলে একেক দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী অপমান জানানোর পদ্ধতি।
বাংলাদেশেও এই প্রতিবাদের ভাষা নতুন নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, সহিংসতার তুলনায় ডিম ছোড়া তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর।
আশির দশকে যেখানে গ্রেনেড ছোড়া, সাপ ছেড়ে দেওয়ার মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ডিম ছোড়া অনেকটাই অহিংস প্রতিবাদ।
সাম্প্রতিক সময়ে নিউইয়র্কে এনসিপি নেতার ওপর ডিম নিক্ষেপ, ঢাকায় সমাবেশে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম ছোড়া, আদালত প্রাঙ্গণে সাবেক মন্ত্রীদের দিকে ডিম ও জুতা ছোড়ার ঘটনা—সবই মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
এসব ঘটনায় বারবার দেখা যায়, মানুষের রাগ জমে গেলে তারা এমন প্রতীকী পথ বেছে নেয়।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের কথায় বিষয়টা সবচেয়ে সহজভাবে বোঝা যায়। ডিম ছোড়ার লক্ষ্য শরীর নয়, ইজ্জত। এখানে আঘাত লাগে সম্মানে।
একটা ডিম জামায় পড়লে শারীরিক ক্ষতি হয় না। কিন্তু সামাজিকভাবে মানুষটা ছোট হয়ে যায়। ক্যামেরা, ভিডিও, আলোচনা—সব মিলিয়ে বার্তাটা অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ে।
এ কারণেই ডিম ছোড়াকে অনেকেই অহিংস প্রতিবাদ বলেন। এটা মারধর নয়। এটা লজ্জা দেওয়া।
ডিম ছোড়া দেখতে ছোট ঘটনা মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ ইতিহাস আর গভীর রাজনৈতিক ভাষা। এটা রাগের প্রকাশ, প্রতিবাদের চিহ্ন, আবার কখনো ক্ষমতার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ।
যতদিন মানুষ কথা বলার জায়গা সংকুচিত মনে করবে, ততদিন এমন প্রতীকী প্রতিবাদ চলতেই থাকবে। ডিম হয়তো ভেঙে যাবে, কিন্তু তার বার্তাটা অনেক দিন টিকে যায়।


