বাংলাদেশের রাজনীতি মানেই বহু বছর ধরে দুটি নাম। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। এই দুই নেত্রীকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে ক্ষমতা, আন্দোলন, নির্বাচন, সংঘাত আর সমঝোতা। সময়ের সঙ্গে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, রূপ নিয়েছে গভীর বৈরিতায়। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়টি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
জানাজায় মানুষের ঢল: রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক অনুভূতি
খালেদা জিয়ার জানাজায় দল-মত নির্বিশেষে মানুষের উপস্থিতি অনেককেই ভাবিয়েছে। ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে দেখা গেছে এমন অনেক মানুষকে, যারা কখনও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের মতো অনেকেই এসেছিলেন সহানুভূতি আর মানবিক টান থেকে। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, কারাবাস আর নিঃসঙ্গতার গল্প সাধারণ মানুষের মনে আলাদা জায়গা তৈরি করেছিল।
এই উপস্থিতি অনেকের কাছে ছিল একটা ইঙ্গিত। রাজনীতির কোলাহল পেরিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত মানুষকেই দেখে।
আকস্মিক রাজনীতি, দীর্ঘ পথচলা
খালেদা জিয়া কখনও পরিকল্পনা করে রাজনীতিতে আসেননি। স্বামী ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি বিএনপির হাল ধরেন। তখন দলটি ছিল ভাঙনের মুখে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার ৪৪ বছরের রাজনৈতিক জীবন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি পরিচিত হন ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে। সেই সময় থেকেই তিনি নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন। তিনি কম কথা বলতেন, কিন্তু সিদ্ধান্তে ছিলেন দৃঢ়। এই বৈশিষ্ট্যই তাকে আলাদা করেছিল।
দুই নেত্রী, এক আন্দোলন, ভিন্ন পথ
একই সময়ে রাজনীতিতে উঠে আসেন শেখ হাসিনাও। ১৯৮১ সালে নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নেন তিনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দুই নেত্রীই ছিলেন সামনের সারিতে। তখন তাদের সম্পর্ক ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, কিন্তু বৈরী নয়।
বিশ্লেষকেরা বলেন, সেই সময় রাজনীতিতে এক ধরনের সহনশীলতা ছিল। মতের পার্থক্য থাকলেও আলোচনার জায়গা ছিল। তবে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্ক বদলাতে থাকে।
ক্ষমতার রাজনীতি ও বৈরিতার শুরু
১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আন্দোলন, ১৯৯৬ সালের একতরফা নির্বাচন, আবার আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরা—এই ঘটনাগুলো দুই দলের মধ্যে দূরত্ব বাড়ায়।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর চারদলীয় জোট সরকার গঠন হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অপারেশন ক্লিনহার্ট এবং পরে র্যাব গঠন—সব মিলিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিল এক বড় মোড়। এই ঘটনার পর খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার সম্পর্ক চূড়ান্ত বৈরিতায় রূপ নেয়।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন ও দমননীতির অভিযোগ
২০০৯ সালের পর শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের শাসনে বিরোধী দমনের অভিযোগ ক্রমেই বাড়তে থাকে। বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা—এসব বিষয় রাজনীতিকে আরও কঠোর করে তোলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনাও হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। এই সময়েই খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালে কারাবন্দী করা হয়। দুই বছর জেল, তারপর শর্তসাপেক্ষ মুক্তি। এই সময় তার স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি হয়।
নির্বাচন, জনবিচ্ছিন্নতা ও গণ-অভ্যুত্থান
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিরোধীদের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন হওয়ায় সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
এই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।
খালেদা জিয়ার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
খালেদা জিয়ার বড় শক্তি ছিল দলকে ধরে রাখা। বহুবার বিএনপি ভাঙার চেষ্টা হয়েছে। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও দলটি চাপে ছিল। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছেন।
তিনি কখনও ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে হারেননি। তার আচরণে ছিল এক ধরনের সংযম। কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি সহনশীল ছিলেন। এই কারণেই অনেক দলের কাছেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক ধরনের অভিভাবকসুলভ নেতা।
দ্বি-দলীয় রাজনীতি কি বদলাবে?
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে একটি অধ্যায় শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাজনীতির কাঠামো কি বদলাবে? বিশ্লেষকেরা সন্দিহান। দুই দলের রাজনীতির বাইরে নতুন শক্তির কথা উঠলেও বাস্তবে সেই আলোচনা থমকে গেছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামী। আসন্ন নির্বাচন ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তবে দ্বি-দলীয় ধারা ভাঙা এখনও কঠিন বলেই মনে করছেন অনেকে।
শেষ কথা
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু দুই ব্যক্তির গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিরই প্রতিচ্ছবি। ক্ষমতা, আন্দোলন, প্রতিহিংসা আর সহনশীলতার মিশ্রণে গড়া এক দীর্ঘ ইতিহাস।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মাধ্যমে সেই ইতিহাসের একটি অধ্যায় বন্ধ হলো। কিন্তু তার রেখে যাওয়া দল, তার রাজনৈতিক প্রভাব এবং সেই দ্বন্দ্বের ছায়া এখনও রাজনীতিতে রয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করবে সময়, নির্বাচন আর নতুন নেতৃত্বের ওপর।


