বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কয়েকটি নাম উচ্চারিত হলেই পুরো একটা সময় চোখের সামনে ভেসে ওঠে, খালেদা জিয়া তাঁদের মধ্যে অন্যতম। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার পথটা মোটেও সহজ ছিল না। ব্যক্তিগত শোক, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, আন্দোলন, ক্ষমতা, বিরোধিতা, কারাবাস আর দীর্ঘ অসুস্থতা—সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার জীবন ছিল নাটকীয় ও ঘটনাবহুল।
সাধারণ জীবন থেকে রাজনীতির কেন্দ্রে
খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে। তাঁর বাবার নাম ইস্কান্দর মজুমদার, মায়ের নাম তৈয়বা মজুমদার। পরিবারিক ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তাঁদের আদি নিবাস ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় হলেও পরিবার পরে দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই তিনি খালেদা জিয়া নামেই পরিচিত হন। তখন তাঁর জীবনের মূল পরিচয় ছিল একজন সংসারী নারী, দুই সন্তান—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে ঘিরেই ছিল তাঁর পৃথিবী।
স্বামীর মৃত্যু ও জীবনের মোড় ঘোরা
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে খালেদা জিয়ার জীবন হঠাৎ করেই পাল্টে যায়। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। সেই সময় তিনি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। এমনকি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থাতেও তাঁকে কোনো রাজনৈতিক ভূমিকায় দেখা যায়নি।
কিন্তু ঠিক এই শোক আর শূন্যতার মধ্যেই বিএনপি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। দলের ভেতরে কোন্দল শুরু হয়, অনেক নেতা সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সঙ্গে যোগ দেন। দল প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখন দলের নেতারাই খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসার অনুরোধ জানান।
বিএনপির হাল ধরা ও নেতৃত্বে উত্থান
১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। প্রথমে তাঁকে ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। মাত্র এক বছরের মধ্যেই, ১৯৮৪ সালের ১০ মে, তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। একজন গৃহবধূ থেকে বড় একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আসা—সে সময়ের বাংলাদেশে এটি ছিল বিরল ঘটনা।
অনেকে তখন বলেছিলেন, তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খালেদা জিয়া প্রমাণ করেন, শুধু পরিচয়ের জোরে নয়, নিজের সিদ্ধান্ত আর নেতৃত্ব দিয়েই তিনি টিকে আছেন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও আপোষহীন নেতৃত্ব
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে ওঠে মূলত এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০—এই দীর্ঘ নয় বছর তিনি রাজপথে ছিলেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সাত দলীয় জোট গঠন করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন।
যখন অনেক দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথে হাঁটছিল, তখন খালেদা জিয়া নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলন চালিয়ে যান। এই অবস্থানই তাঁকে “আপোষহীন নেত্রী” হিসেবে পরিচিত করে তোলে। এই সময়ে তাঁকে তিনবার গ্রেপ্তারও করা হয়।
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও সংসদীয় ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন
১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি পাঁচটি আসনে নির্বাচন করে সবগুলোতেই জয়ী হন, যা তাঁর জনপ্রিয়তার বড় প্রমাণ।
এই সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল। দীর্ঘ ১৬ বছর পর রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসে বাংলাদেশ। এই সিদ্ধান্তে সব দলের ঐকমত্য ছিল, আর নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া।
ক্ষমতা, বিরোধিতা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলন
প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিতে তীব্র আন্দোলনের মুখে পড়ে বিএনপি সরকার। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আবার সরকার গঠন হলেও সেই সংসদ টিকে ছিল মাত্র ১২ দিন। পরে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়।
এরপরের নির্বাচনে খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসেন। ২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।
জোট রাজনীতি ও সমালোচনা
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জামায়াতে ইসলামিসহ কয়েকটি দলকে নিয়ে চার দলীয় জোট গঠন করে, যা পরে ২০ দলীয় জোটে রূপ নেয়। এই জোটে ধর্মভিত্তিক দলের আধিক্য নিয়ে সমালোচনা ছিল ব্যাপক। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি ছিল সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল।

কারাবাস, সাজা ও দীর্ঘ অসুস্থতা
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এবং ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হয়। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাঁর ১৭ বছরের সাজা হয়।
দীর্ঘদিন কারাবাসের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থা মারাত্মকভাবে খারাপ হয়ে যায়। তিনি লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা, ডায়াবেটিস ও আর্থরাইটিসে ভুগছিলেন। ২০২৪ সালে তাঁর হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয় এবং লিভারের জটিল চিকিৎসাও নেওয়া হয়।
মুক্তি, সীমিত রাজনীতি ও শেষ সময়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এরপর তিনি সীমিত আকারে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বয়স ও অসুস্থতার কারণে তিনি আর আগের মতো সক্রিয় ছিলেন না।
২০২৫ সালে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান ঘটায়।
ইতিহাসে খালেদা জিয়ার স্থান
খালেদা জিয়া শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সংগ্রামী নারী, যিনি পুরুষশাসিত রাজনীতিতে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে, বিরোধী রাজনীতিতে এসেছে দৃঢ়তা, আর বাংলাদেশের রাজনীতি পেয়েছে এক শক্তিশালী নারী কণ্ঠ।
ভালো-মন্দ মিলিয়েই ইতিহাস তৈরি হয়। খালেদা জিয়ার জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু একজন গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার গল্পটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে চিরকাল আলাদা গুরুত্ব নিয়ে স্মরণ করা হবে।


