ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-তে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশৃঙ্খলা, হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় যাদের আক্রমণের শিকার হতে হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। অথচ হামলাকারী মব বা সংগঠিত দলটির বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। এই ঘটনা নিয়ে সমাজে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। এ খবর বিবিসি বাংলার।
ঘটনার দিন সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীসহ ১৬ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ দাবি করছে, নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তারা ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে—হামলাকারীরা দৃশ্যমানভাবে ধাওয়া, মারধর, গলা চেপে ধরা, ব্যানার ছেঁড়া এবং চেয়ার ভাঙার মতো অপরাধ করলেও তাদের বিরুদ্ধে কেন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলো না?
শাহবাগ থানার ওসি খালিদ মনসুর জানান, “মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে কারও অভিযোগ করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাদী হলে তবেই মামলা হবে।”
‘মঞ্চ ৭১’ নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধ ও সংবিধানের মর্যাদা রক্ষার দাবিতে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক ও সাংবাদিকরা অংশ নেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনের বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই হঠাৎ ২০-২৫ জন সেখানে ঢুকে পড়ে স্লোগান শুরু করে। তারা “আওয়ামী ফ্যাসিস্ট” বলে চিৎকার করে এবং অংশগ্রহণকারীদের ওপর হামলা চালায়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজনকে টেনে-হিঁচড়ে বের করা, গলা চেপে ধরা ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।
‘মঞ্চ ৭১’-এর সমন্বয়ক ও মানবাধিকার আইনজীবী জেড আই খান পান্না অভিযোগ করেন, হামলার পেছনে জামায়াত নেতাকর্মীদের হাত রয়েছে। তার দাবি, ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে হামলাকারীদের একজন জামায়াত নেতার সঙ্গে আগে প্রকাশ্যে ছিলেন।
তবে জামায়াতের পল্টন থানার নেতা শাহীন আহমেদ খান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “অনেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে সেখানে গিয়েছিল, কিন্তু তা জামায়াতের কোনো কর্মসূচি ছিল না।”
পুলিশ বলছে, মামলাটি তদন্তাধীন, আর সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু অনেকেই মনে করছেন, সরকারের অবস্থান এই ঘটনায় পক্ষপাতদুষ্ট।

সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, “এটি অতীতের ফ্যাসিস্ট শাসনের পুনরাবৃত্তি।” তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়, বরং এটি জাতির অর্জন।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন মন্তব্য করেন, “যাদের হেনস্তা করা হলো তাদের বিরুদ্ধেই মামলা করা জনগণকে ভুল বার্তা দিচ্ছে। এতে মানুষ ক্ষুব্ধ হবে।”
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকীকে ধাক্কা দেওয়া হয়, আইনজীবী কাজী এ টি এম আনিসুর রহমান বুলবুলের গলা চেপে ধরা হয়, আরেকজনকে হ্যান্ডমাইক দিয়ে আঘাত করা হয়। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে বিশৃঙ্খলা চলার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। কিন্তু তখনও আক্রমণকারীদের গ্রেপ্তার না করে বরং ভুক্তভোগীদের আটক করা হয়।
আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধানকে দলীয়ভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। এটি বিচারব্যবস্থার ভঙ্গুর অবস্থা স্পষ্ট করে।”
মানবাধিকার আইনজীবী পান্না আরও বলেন, “যারা আক্রমণের শিকার হলেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলো, অথচ হামলাকারীরা মুক্ত। এর চেয়ে অদ্ভুত কিছু হতে পারে না।”
বিভিন্ন বিশ্লেষক মনে করছেন, এই ঘটনা কেবল একটি আক্রমণ নয়, বরং গণতান্ত্রিক অধিকার ও মুক্ত আলোচনার ওপর সরাসরি আঘাত। তাদের মতে, এভাবে ভিন্নমত দমন করা হলে দেশে আবারও ফ্যাসিবাদী রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।


