ভারত মহাসাগরের শান্ত জল হঠাৎ করেই যুদ্ধের আগুনে উত্তপ্ত হয়ে উঠল। শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছেই ডুবে গেল ইরানের যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি স্বীকার করেছে, তাদের ডুবোজাহাজ থেকে ছোড়া টর্পেডোতেই এই রণতরী ডুবে গেছে। ঘটনায় অন্তত ৮৭ জন নৌসেনা সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই হামলা নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একটি সামরিক হামলা নয়; এটি ভারত মহাসাগর অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
বুধবার ভোরে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছিল ইরানের যুদ্ধজাহাজটি। ঠিক ভোর ৫টা ৮ মিনিটে জাহাজ থেকে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর কাছে বিপদ সংকেত পাঠানো হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শক্তিশালী বিস্ফোরণের পর দ্রুত ডুবতে শুরু করে রণতরীটি।
প্রাথমিকভাবে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, কোনও এক ডুবোজাহাজ থেকে হামলা হয়েছে। কিন্তু তখনও হামলাকারীর পরিচয় স্পষ্ট ছিল না। পরে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর Pentagon আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তাদের সাবমেরিন থেকেই টর্পেডো ছোড়া হয়েছে।
ভাবতে পারেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি যুদ্ধজাহাজ। চারপাশে খোলা সমুদ্র। হঠাৎ নিচ থেকে আঘাত। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সবকিছু বদলে গেল।
মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ সাংবাদিক বৈঠকে স্পষ্ট ভাষায় জানান, “আমাদের টর্পেডোতেই ইরানের যুদ্ধজাহাজ ডুবে গেছে।” তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকলেই কেউ নিরাপদ থাকবে—এই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথমবার টর্পেডো হামলায় শত্রুপক্ষের বড় যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়েছে আমেরিকা। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বড়সড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—হেগসেথ সরাসরি শ্রীলঙ্কার নাম উল্লেখ না করলেও স্থানীয় সূত্র এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে, ঘটনাস্থল শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের কাছেই।
শ্রীলঙ্কার বিদেশমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ পার্লামেন্টে জানান, জাহাজটিতে মোট ১৮০ জন আরোহী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তারা ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সমুদ্রের ঢেউ, ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে এই উদ্ধার অভিযান ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
একটু কল্পনা করুন—অন্ধকার ভোর, চারপাশে সমুদ্রের গর্জন, আর ডুবে যাওয়া জাহাজের মানুষজন জীবন বাঁচাতে লড়ছে। দৃশ্যটা সিনেমার মতো মনে হলেও বাস্তবে এটি ছিল এক নির্মম ট্র্যাজেডি।
ইরানের এই যুদ্ধজাহাজটি আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত ছিল। দীর্ঘপাল্লার মিশন পরিচালনার ক্ষমতা ছিল এর। আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করলেও, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি—জাহাজটি তাদের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠছিল।
তবে ইরান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগ স্বীকার করেনি। তেহরান থেকে জানানো হয়েছে, তারা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করছে।
এই প্রশ্নটাই এখন সবার মনে—এটি কি আত্মরক্ষার পদক্ষেপ, নাকি শক্তি প্রদর্শনের কৌশল?
ঘটনাস্থল শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছাকাছি হওয়ায় দেশটি কূটনৈতিক চাপে পড়েছে। যদিও হামলায় তাদের কোনও প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই, তবুও তাদের জলসীমার নিকটে এমন বড় সামরিক সংঘর্ষ উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
শ্রীলঙ্কা সরকার জানিয়েছে, তারা মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে এবং উদ্ধার অভিযানে সর্বোচ্চ সহায়তা দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা চায়, তাদের জলসীমা আন্তর্জাতিক শক্তির সংঘর্ষের ময়দান না হয়ে উঠুক।
আন্তর্জাতিক জলসীমা মানে এমন একটি এলাকা, যেখানে কোনও একক দেশের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেখানে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, আত্মরক্ষার যুক্তিতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এই হামলা কি সেই আইনি সীমার মধ্যে পড়ে? নাকি এটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামুদ্রিক সংঘাতের ইঙ্গিত?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা ভারত মহাসাগরে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার সূচনা করতে পারে। কারণ এই অঞ্চল দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের বড় অংশ পরিচালিত হয়। এখানে অস্থিরতা মানেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব।
ভারত মহাসাগর শুধু জলরাশি নয়, এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইরান—সব বড় শক্তির নজর এই এলাকায়।
এই হামলা প্রমাণ করে, শক্তিধর দেশগুলো এখন সমুদ্রপথেও সরাসরি সংঘর্ষে জড়াতে পিছপা হচ্ছে না। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবমেরিন ও টর্পেডো প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতের নৌযুদ্ধে আরও বাড়বে।
এখন সবার নজর ইরানের প্রতিক্রিয়ার দিকে। তারা কি পাল্টা ব্যবস্থা নেবে? নাকি কূটনৈতিক পথ বেছে নেবে?
একটি বিষয় পরিষ্কার—এই হামলা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। ভারত মহাসাগরে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে। ছোট দেশগুলোও কৌশলগতভাবে সতর্ক অবস্থান নিতে বাধ্য হবে।
শেষ কথা হলো, সমুদ্র যতই বিশাল হোক, সেখানে শান্তি ভঙ্গ হলে তার ঢেউ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানি রণতরী ডুবে যাওয়ার এই ঘটনা শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়; এটি বৈশ্বিক রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।



