৫ আগস্ট বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ পাঠ শুরু করেন, তখন তার পাশে থাকা এক তরুণীকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কে এই সাহসী তরুণী? কেন তিনি এত গুরুত্বের সঙ্গে সেই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন?
পরিচয় প্রকাশ: শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতের বোন
তদন্ত করে জানা গেছে, এই তরুণী হলেন শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতের বোন, সাবরিনা আফরোজ শাবন্তী। তার ভাই সৈকত গত বছর ১৯ জুলাই, গণঅভ্যুত্থানের সময় শহীদ হন। তাঁর মৃত্যু ছিল সেই আন্দোলনের এক হৃদয়বিদারক এবং অনুপ্রেরণাদায়ী অধ্যায়, যা ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঘোষণাপত্র পাঠের আগে সাবরিনার আবেগঘন বক্তব্য
প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণাপত্র পাঠ শুরুর আগে, সাবরিনা শাবন্তী একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী ভাষণ দেন। তিনি বলেন:
“এক বছর আগে ১৯ জুলাই, আমরা যখন আমার ভাইয়ের নিথর দেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাই, তখন তার মাথায় রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ ছিল। মৃত্যুর কারণ লেখা ছিল ‘গান শট’। আমার ভাইয়ের উচ্চতা ছিল ৬ ফুট ২ ইঞ্চি। আমার বাবা সবসময় এই উচ্চতা নিয়ে গর্ব করতেন। অথচ সেই উচ্চতাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।”
পরিবার থেকে জাতীয় পরিবারে রূপান্তর: আশার বার্তা
সাবরিনা বলেন, “আমি ও আমার পরিবার যখন দেখি, আমরা আর শুধু আমাদের পরিবার নই, আজ আমরা পুরো দেশের পরিবারে পরিণত হয়েছি, তখন কিছুটা স্বস্তি পাই। আমরা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠি।”
তার মতে, সেই সময় দেশের পরিস্থিতি ছিল একেবারে অনিশ্চিত। “ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে হচ্ছিল। কোনো আশার আলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখনই এই সফল গণঅভ্যুত্থান আমাদের নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখায়। আমরা যেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কোনোদিন পিছিয়ে না পড়ি।”
স্মরণে শহীদ সৈকত: একটি প্রতীক হয়ে ওঠা তরুণ
সাবরিনার ভাই, মাহামুদুর রহমান সৈকতের শহীদ হওয়া ছিল না শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, বরং সেটি পরিণত হয় পুরো দেশের গণআন্দোলনের প্রতীক-এ। তার রক্তাক্ত দেহ, তার উচ্চতা, এবং তার পরিবারের বেদনাদায়ক স্মৃতি আজ জাতির সামনে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের এক বাস্তব দলিল।
ঘোষণাপত্র পাঠের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এই ঘোষণাপত্রটি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের দলিল, যা অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করে। সাংবিধানিক সংস্কার, নতুন রাজনৈতিক চুক্তি, এবং জনগণের প্রত্যাশা এই ঘোষণাপত্রে প্রতিফলিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বুদ্ধিজীবী ও তরুণ সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এর মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—এই বাংলাদেশ তরুণদের নেতৃত্বেই গড়ে উঠবে।
নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতীক সাবরিনা শাবন্তী
ড. ইউনূসের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সেই তরুণী শুধু শহীদ সৈকতের বোন নন—তিনি নতুন বাংলাদেশের প্রতীক। তার বক্তব্য, তার সাহসিকতা, এবং তার চোখে দেখা ভবিষ্যতের স্বপ্ন পুরো জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, একজন শহীদের পরিবারই কেবল ক্ষতবিক্ষত নয়, বরং তারা হয়ে উঠতে পারে জাতির আত্মার প্রতিধ্বনি। সাবরিনার কণ্ঠে যেন উচ্চারিত হয় গণআন্দোলনের প্রেরণা, ঐক্য এবং দৃঢ় প্রত্যয়।


