বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনীতির অন্দরমহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। শুধু বিরোধী দল নয়, বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীর মধ্যেও এই সিদ্ধান্ত ঘিরে স্পষ্ট বিস্ময় ও অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তার ভূমিকা নিয়ে যেসব প্রশ্ন ও সমালোচনা ছিল, সেগুলো এখনও পুরোপুরি থামেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, একজন বিতর্কিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিকে এমন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন উঠছে। অন্যদিকে বিএনপির ভেতরের একটি অংশ মনে করছে, সিদ্ধান্তটির পেছনে কূটনৈতিক বাস্তবতা কাজ করেছে।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় স্বীকার করছেন, খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা তাদের জন্য কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তার কর্মকাণ্ড নিয়ে দলটির শীর্ষ নেতারাই প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন।
একসময় বিএনপি শুধু সমালোচনাতেই থেমে থাকেনি; তাকে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে সরানোর দাবিও তুলেছিল। ফলে এখন হঠাৎ করেই তাকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় দলের ভেতরে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সহজভাবে বললে, যাকে গতকাল পর্যন্ত সমালোচনা করা হয়েছে, তাকেই আজ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া—এই পরিবর্তনটাই অনেকের কাছে ধাক্কার মতো লেগেছে।
নতুন সরকারের প্রথম দিনেই নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ড. খলিলুর রহমান। সেখানে তাকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়—অন্তর্বর্তী সরকার থেকে এসে বিজয়ী দলের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া কি স্বার্থের সংঘাত তৈরি করছে না?
জবাবে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তিনি জোর করে আসেননি। মানুষের ধারণা সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে—এ কথাও উল্লেখ করেন তিনি। নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে যে অভিযোগ উঠছে, সেটিকেও তিনি খোলামেলা চ্যালেঞ্জ করেন।
তার বক্তব্যে বোঝানোর চেষ্টা ছিল—নিজের নিয়োগকে তিনি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখছেন।
খলিলুর রহমানকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি প্রথমে রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই দুই পর্যায়েই তার কিছু সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা হয়।
বিশেষ করে তিনটি বিষয় বেশি আলোচিত হয়েছিল— প্রথমত, তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন, দ্বিতীয়ত, মিয়ানমার সীমান্তে মানবিক করিডরের প্রস্তাব, তৃতীয়ত, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক ।
এই ইস্যুগুলোতে বিএনপির শীর্ষ নেতারাও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন। এমনকি ২০২৫ সালের মে মাসে বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন তার পদত্যাগও দাবি করেছিলেন।
খলিলুর রহমানকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো তার যুক্তরাষ্ট্র-সংযোগ। বিএনপির কিছু নেতা একসময় অভিযোগ তুলেছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
তবে তিনি ধারাবাহিকভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি—বাংলাদেশি পাসপোর্ট ছাড়া অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট তার নেই।
ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারী হতে পারেন এবং দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস করেছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দুই দশকের বেশি সময় বিদেশে থাকার কারণেই এই প্রশ্নগুলো বারবার সামনে আসছে।
জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেটিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি বিএনপির কিছু নেতাও অভিযোগ করেছিলেন—চুক্তিতে দেশের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা হয়নি।
এই সমালোচনার তীরও অনেকটা খলিলুর রহমানের দিকেই গিয়েছিল। কারণ, আলোচনায় তার সক্রিয় ভূমিকার কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়।
এখন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ায় অনেকেই ভাবছেন—এই চুক্তির ধারাবাহিকতা কি আগের মতোই থাকবে?
এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিএনপির নেতারা প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা না বললেও, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা অনানুষ্ঠানিকভাবে একটি যুক্তি দিচ্ছেন।
তাদের মতে, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ কাজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় রাখতে অভিজ্ঞ ও পেশাদার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দরকার। খলিলুর রহমানের পেশাগত অভিজ্ঞতা এই জায়গায় কাজে লাগতে পারে—এমন ধারণা থেকেই তাকে নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, রাজনৈতিক অস্বস্তি থাকলেও বাস্তব কূটনৈতিক প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—এমনটাই বলছেন তারা।
সাবেক কয়েকজন কূটনীতিক ভিন্ন একটি দিক তুলে ধরছেন। তাদের মতে, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে লন্ডনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছিল, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সাক্ষাৎ হয়।
সেই সফরে খলিলুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ওই সময় থেকেই বিএনপির সঙ্গে তার যোগাযোগ নতুনভাবে দৃঢ় হয়।
তারা আরও মনে করিয়ে দেন—২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে তার পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল। ফলে পুরো বিষয়টি হঠাৎ ঘটেনি, বরং দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা থাকতে পারে।
খলিলুর রহমান এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ায় আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা কি বজায় থাকবে?
কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, নীতির বড় কোনো নাটকীয় পরিবর্তন নাও আসতে পারে। বিশেষ করে ভারতসহ আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা দেখা যেতে পারে।
তবে অন্য অংশের কূটনীতিকেরা সতর্ক করছেন—যদি নীতির ভারসাম্য ঠিকভাবে রক্ষা না হয়, তাহলে বাংলাদেশ একদেশকেন্দ্রিক কূটনীতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিনেই তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তারা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির ধারা অনুসরণ করবেন। তার ভাষায়, সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থই প্রাধান্য পাবে।
কিন্তু বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছে, কথার চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপই এখানে আসল পরীক্ষা হবে। কারণ, সামনে রয়েছে রোহিঙ্গা সংকট, বৈশ্বিক বাণিজ্য চাপ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণ।
সব মিলিয়ে খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএনপির ভেতরের বিস্ময়, বিরোধী দলের সমালোচনা এবং কূটনৈতিক মহলের কৌতূহল—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনো আলোচনার কেন্দ্রেই রয়েছে।
আগামী মাসগুলোতে তার কূটনৈতিক পদক্ষেপই ঠিক করে দেবে—এই সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য কৌশলগত সাফল্য ছিল, নাকি রাজনৈতিক ঝুঁকি।
রাজনীতির ভাষায় একটা কথা আছে—সময়ই শেষ বিচারক। এখন সবাই সেই সময়ের অপেক্ষায়।



