বাংলাদেশের রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে একটি নাম ক্রমেই উঠে আসছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে—জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত বছরের ছাত্র-জনতার আন্দোলন থেকে উঠে আসা এ দলটি আত্মপ্রকাশের প্রায় পাঁচ মাস পরও তাদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ বা কাঠামো এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বরং, বিভিন্ন কর্মসূচি ও বক্তব্যে তাদের প্রধান রাজনৈতিক অবস্থান যেন শুধুই আওয়ামী লীগবিরোধিতা।এ খবর বিবিসি বাংলার।
এই প্রবণতাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে প্রশ্ন জাগাচ্ছে: আওয়ামী লীগবিরোধিতাকে পুঁজি করেই কি এনসিপির রাজনীতি এগোচ্ছে?
এনসিপির অবস্থান: আদর্শহীন বিরোধিতা?
দলের সিনিয়র নেতারা যদিও বরাবরই দাবি করেছেন যে তাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, তবে কার্যক্ষেত্রে তারা যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করছে, তার বেশিরভাগই কেন্দ্রীভূত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতীকী হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
যেমন:
- গোপালগঞ্জে “মুজিববাদ মুর্দাবাদ” স্লোগান ও সহিংসতা
- ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার সমর্থন
- প্রধান উপদেষ্টার বাড়ি ঘেরাও
- দলীয় কার্যালয়ের দখল ও “জুলাইযোদ্ধার অফিস” প্রতিষ্ঠা
এই ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে তৈরি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন:
“তারা এখনো এমন কোনো বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেনি যা এনসিপির ভবিষ্যৎ দিশা স্পষ্ট করে। তাদের কর্মকাণ্ড কেবল ফ্যাসিস্টবিরোধিতা আর আওয়ামী লীগের বিরোধীতায় আটকে আছে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন:
“তারা সংস্কার বা রাষ্ট্রগঠনের ভাবনা না এনে শুধুই ভাঙা, ধ্বংস বা উসকানিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিচ্ছে। এটা রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার প্রকাশ।”
রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহায়তায় রাজনীতি?
এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহায়তা নেওয়া নিয়েও ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গোপালগঞ্জ ও কক্সবাজারে এনসিপি নেতাদের সুরক্ষায় সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান ব্যবহারের ঘটনায় সাধারণ জনগণ ও বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, এটা কি সত্যিকারের গণআন্দোলনের রূপ? নাকি রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় পরিচালিত একটি কৌশলগত দল?
এ বিষয়ে অধ্যাপক স্নিগ্ধা বলেন:
“রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সাহায্যে জনসংযোগ হয় না। মানুষকে মন থেকে ছুঁতে না পারলে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব নয়।”
এনসিপির দাবি: শুধু প্রতিরোধ নয়, পুনর্গঠনের চিন্তা
যদিও এসব সমালোচনার জবাবে এনসিপি নেতারা বলছেন—তাদের বর্তমান পর্যায়ের কর্মসূচি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদ, গুম, খুন, দমন-পীড়নের বিচার চাওয়াই এখন তাদের অগ্রাধিকার। তারা আরও বলছেন, ভবিষ্যতে তারা দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দেবে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য শুধু কাউকে সরানোর ভাষা নয়, বিকল্প পথও তুলে ধরতে হয়।
“হিতে বিপরীত” হওয়ার শঙ্কা
সাব্বির আহমেদ বলেন:
“যদি এনসিপি শুধু বিরোধিতার ভিত্তিতে টিকে থাকার চেষ্টা করে, তাহলে সেটি শুধু সহিংসতার জন্ম দেবে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হবে।”
উপসংহার
এনসিপি কী চায়? এটা কি শুধুই “মুজিববাদ হটাও”, নাকি আসলেই তারা রাষ্ট্র ও সমাজের একটি ভিন্ন, যুক্তিসংগত, ন্যায়ভিত্তিক গঠন প্রস্তাব করছে?
এ প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট। যতদিন না দলটি একটি সুস্পষ্ট নীতি, মতাদর্শ ও সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে পারছে, ততদিন পর্যন্ত তাদের রাজনীতি আওয়ামী লীগবিরোধিতার চৌহদ্দির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
এনসিপি যদি সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক ধারা গড়তে চায়, তবে কেবল ‘ধ্বংসের রাজনীতি’ নয়, প্রয়োজন নির্মাণের দর্শন।


