বাংলাদেশের সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও বড় সিদ্ধান্তগুলো কোথায় এবং কীভাবে নেওয়া হতো—এ নিয়ে মুখ খুলেছেন সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। তার দাবি, উপদেষ্টা পরিষদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরে থেকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হতো। ফলে সরকারের ভেতরে একটি প্রভাবশালী অনানুষ্ঠানিক বলয়ের অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দেড় বছর মেয়াদি এই সরকারের নানা অজানা দিক তুলে ধরেন। তার বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে যেমন আলোড়ন তুলেছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল বাড়িয়েছে—আসলে কী ঘটছিল অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে?
সাখাওয়াত হোসেনের কথায়, উপদেষ্টা পরিষদে ২৭ জন সদস্য থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনেক সময় আগেই নির্ধারিত হয়ে যেত। অর্থাৎ বৈঠক ছিল অনেকটা আনুষ্ঠানিকতার মতো।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বড় নীতি নির্ধারণের আগে অনেক বিষয় পরিষদের সামনে পূর্ণাঙ্গভাবে তোলা হতো না। এতে করে যৌথ আলোচনার সুযোগ কমে যেত। তার মতে, একটি সরকারের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অবশ্যই আনুষ্ঠানিক ফোরামে আলোচনা হওয়া উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এমন অভিযোগ সত্য হলে তা প্রশাসনিক জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া—দুই ক্ষেত্রেই বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সাখাওয়াত হোসেনের অভিজ্ঞতা কম নয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি নিজেই জানিয়েছেন—নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে তাকে কার্যত অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।
তার ভাষায়, নির্বাচন কমিশনে দীর্ঘদিন কাজ করার পরও কেউ তার মতামত জানতে চায়নি। তিনি সরাসরি বলেন, “আমি তাদের কনসালট্যান্ট ছিলাম না।” এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, সরকারের ভেতরে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল বলে তিনি মনে করেন।
তবে নির্বাচন ১৮ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়াকে তিনি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, সময়ক্ষেপণের আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হওয়া দেশের জন্য ভালো হয়েছে।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল তথাকথিত “কিচেন ক্যাবিনেট” প্রসঙ্গ। সাধারণভাবে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয় এমন এক ক্ষুদ্র প্রভাবশালী গোষ্ঠী বোঝাতে, যারা আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থেকেও বড় সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
সাখাওয়াত হোসেন সরাসরি কারও নাম বলেননি। তবে তার ইঙ্গিত পরিষ্কার—সরকারের ভেতরে এমন একটি বলয় ছিল, যারা মূল সিদ্ধান্ত আগে থেকেই ঠিক করে রাখত।
ধরা যাক, একটা বড় পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। সবাইকে বসিয়ে আলোচনা করার কথা থাকলেও যদি কয়েকজন আগেই ঠিক করে নেয়—তাহলে বাকি সবাই শুধু শুনে যায়। তার বক্তব্যে অনেকটা এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর আরেকটি কারণে আলোচনায় আসেন তিনি। পুলিশের ব্যবহৃত ‘সেভেন পয়েন্ট সিক্স টু’ বোরের রাইফেলের ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে তখন তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন।
সাক্ষাৎকারে তিনি আবার বিষয়টি সামনে আনেন। তার দাবি, ভিডিও ফুটেজে তিনি দেখেছেন—লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরা কিছু ব্যক্তির হাতে পুলিশের রাইফেল ছিল। বিষয়টি তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছিল।
আরও চাঞ্চল্যকরভাবে তিনি বলেন, হেলিকপ্টারে থাকা কিছু স্নাইপারের শারীরিক গঠন ও চেহারা দেশের মানুষের সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি বলে তার সন্দেহ হয়েছিল। এখান থেকেই তিনি ‘বহিরাগত’ থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, পূর্ণ তদন্তের সুযোগ তিনি পাননি।
সাখাওয়াত হোসেনের দাবি অনুযায়ী, তিনি বিষয়টি তদন্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে শ্রম ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
তার ভাষায়, এই বদলির ফলে তিনি তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারেননি। ফলে রাইফেল ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র অজানাই থেকে যায়।
প্রশাসনিক মহলে অনেকেই মনে করেন, এমন দ্রুত দায়িত্ব পরিবর্তন হলে কোনো উদ্যোগই পূর্ণতা পায় না। সাখাওয়াতের বক্তব্য সেই ধারণাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি নিজেই প্রকাশ করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাত-আট দিনের মধ্যেই তিনি নাকি উপদেষ্টা পরিষদ থেকে সরে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন।
তিনি জানান, তখনকার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস–কে তিনি বলেছিলেন যে তার পক্ষে থাকা কঠিন হবে এবং এতে প্রধান উপদেষ্টাও বিব্রত হতে পারেন।
কিন্তু প্রধান উপদেষ্টার অনুরোধে তিনি শেষ পর্যন্ত দায়িত্বে থেকে যান। এই অংশটি অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ—কারণ এটি সরকারের ভেতরের চাপ ও মতবিরোধের ইঙ্গিত দেয়।
সাখাওয়াত হোসেন নতুন কেউ নন। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রশাসনিক ও নির্বাচনী কাঠামো সম্পর্কে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম সদস্য হিসেবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন, একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি তার অভিজ্ঞতার ভেতরের গল্প প্রকাশ্যে আনলেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতা ছাড়ার পর এমন খোলামেলা বক্তব্য অনেক সময় ভেতরের বাস্তব চিত্র বোঝার সুযোগ করে দেয়।
সাখাওয়াত হোসেনের এই মন্তব্য কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করছে।
তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
সাধারণ মানুষের ভাষায় বললে—সরকারের ভেতরের “রান্নাঘর” যদি আলাদা কোথাও চলে, তাহলে মূল টেবিলে বসা লোকজন কতটা জানে—সেই প্রশ্নটাই এখন ঘুরছে।
এই বিস্ফোরক মন্তব্যগুলো প্রকাশিত হয়েছে চ্যানেল ওয়ান–এ প্রচারিত একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে। সাক্ষাৎকার প্রচারের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা তুঙ্গে।
অনেকে তার বক্তব্যকে সাহসী বলেছেন, আবার কেউ কেউ মনে করছেন—এগুলো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা দরকার।
সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য নতুন করে একটি পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনেছে—সরকারি সিদ্ধান্ত আসলে কোথায় নেওয়া হয়? আনুষ্ঠানিক সভায়, নাকি অদৃশ্য কোনো প্রভাবশালী বলয়ের মধ্যে?
তিনি যে সব প্রশ্ন তুলেছেন, সেগুলোর অনেকগুলোরই এখনো পরিষ্কার উত্তর মেলেনি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—তার এই সাক্ষাৎকার অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যপ্রণালী নিয়ে নতুন বিতর্কের দরজা খুলে দিয়েছে।
আগামী দিনে এসব অভিযোগ নিয়ে আরও আলোচনা হবে—এটা বলাই যায়। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে মানুষের আগ্রহ কখনোই কমে না।
সূত্র: চ্যানেল ওয়ানে প্রদত্ত সাক্ষাৎকার



