বারবার সচিবালয় ঘিরে আন্দোলন: কেন কেন্দ্রবিন্দু এই প্রশাসনিক ভবন?
গত ১১ মাসে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবন সচিবালয় যেন আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রস্থলে রূপ নিয়েছে। শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদেরও বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে সচিবালয়ের গেটে অবস্থান নিতে। সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও দাবিদাওয়া আদায়ে এই প্রশাসনিক ভবনটি যেন প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সাবেক দুই শীর্ষ আমলা জানিয়েছেন, সরকারের দুর্বলতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সেই সাথে, বর্তমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ।
সচিবালয় ভাঙচুরের ঘটনা: হুঁশিয়ারি না ব্যবস্থা?
শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারের পদত্যাগ দাবিতে শত শত শিক্ষার্থী সচিবালয়ে ঢুকে পড়ে, নির্বিচারে গাড়ি ও স্থাপনার ভাঙচুর চালায়। এর আগে আরও অন্তত চারবার গেট ভাঙার ঘটনা ঘটেছে, যার প্রত্যেকটিই অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এসব ঘটনার পরেও কেন সরকার কার্যকর কোনো কঠোর বার্তা দিতে পারেনি?
সাবেক সচিব আব্দুল আওয়াল মজুমদার বলেন, “৫ আগস্টের পর যে বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা এখনও সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সরকার প্রথমদিকে কঠোর না হওয়ায় বাকিরাও সাহস পেয়েছে।” তাঁর মতে, সরকার নিজের কর্তৃত্ব হারিয়েছে বলেই সচিবালয়কে কেউ আর ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ মনে করছে না।
দায় কার? সরকার না উপদেষ্টাদের?
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার দেশের দায়িত্বে থাকলেও তাদের মূল প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়কে তারা রক্ষা করতে পারছে না। এটি সরকারের দুর্বলতা ও অযোগ্যতার বড় উদাহরণ।”
তাঁরা মনে করেন, এই পরিস্থিতির জন্য শুধু সরকার নয়, বরং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আমলা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার নেতারাও সমানভাবে দায়ী।
এইচএসসি পরীক্ষা রাত ৩:৩০-এ স্থগিত করার মতো সিদ্ধান্তকে তারা ‘চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনা’ বলে উল্লেখ করেন। আব্দুল আওয়াল মজুমদার বলেন, “যদি এই সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া হতো এবং কেউ দুঃখ প্রকাশ করত, তাহলে এমন বিশৃঙ্খলা হতো না।”
আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক উস্কানি? সতর্ক থাকার পরামর্শ
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের দুর্বলতা ও বিশৃঙ্খল অবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাচ্যুত দলটি এই সুযোগে জনগণের মধ্যে সরকারবিরোধী মনোভাব বাড়াতে পারে।
আবু আলম শহীদ খান বলেন, “সরকার কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে জনতা সংঘবদ্ধ হবে, আর উগ্রবাদীরা তা ব্যবহার করবে? অতীতে অনেক সরকারই নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এমন সুযোগ তৈরি করেছে।”
আব্দুল আওয়াল মজুমদার আরও বলেন, “আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সুবিধা নিতেই চেষ্টা করবে। এমনকি তাদের উস্কানিও থাকতে পারে। তাই পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে সরকারের উচিত ছিল কঠোর অবস্থান নেওয়া। কিন্তু তারা তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।”
নির্বাচনই হতে পারে উত্তরণের পথ, কিন্তু রয়েছে শঙ্কাও
এই দুই সাবেক সচিব মনে করেন, জনগণের আস্থা অর্জন এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের উচিত দ্রুত জাতীয় নির্বাচন ঘোষণা করা।
তবে নির্বাচন ঘিরেও শঙ্কা রয়েছে। একদিকে সরকারকে বিশ্বাস করছে না জনগণ, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও রয়েছে সংশয়।
আবু আলম শহীদ খান বলেন, “এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচনের আয়োজন। তবে এই নির্বাচন যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।”


