বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ মানেই শুধু ক্রিকেট নয়, সঙ্গে আবেগ, আলোচনা আর অল্প একটু নাটক। ২০২৫-২৬ মৌসুমের দ্বাদশ বিপিএলও তার ব্যতিক্রম নয়। শুক্রবার সিলেট ও রাজশাহীর ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে এবারের টুর্নামেন্ট। মাঠে গড়ানোর আগেই নতুন দল, অভিনব ঘটনা আর বিতর্কে শিরোনাম হয়ে উঠেছে বিপিএল।
এবারের আসরে মোট ৩৪টি ম্যাচ হবে। ভেন্যু তিনটি—সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা। শুরুটা হচ্ছে সিলেট পর্ব দিয়ে। সেখানেই উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে সিলেট টাইটানস ও রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। এরপর চট্টগ্রাম ঘুরে শেষ ধাপে আবার ঢাকায় ফিরবে বিপিএল। বিসিবি বলছে, নতুন আমেজে আয়োজন। তবে মাঠের বাইরে তাকালেই দেখা যাচ্ছে, নতুনের পাশাপাশি পুরোনো ঝামেলাও ঠিকই ফিরে এসেছে।
বিপিএলে নতুন সংযোজন নোয়াখালী এক্সপ্রেস
এবারের বিপিএলের সবচেয়ে আলোচিত সংযোজন নিঃসন্দেহে নোয়াখালী এক্সপ্রেস। বহুদিন ধরেই সামাজিক মাধ্যমে “নোয়াখালী বিভাগ চাই” স্লোগান শোনা যায়। বিভাগ না হলেও এবার অন্তত বিপিএলে একটি দল পেয়েছে নোয়াখালী।
নোয়াখালী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়া এই দলটি প্রথমবারের মতো বিপিএলে খেলতে নামছে। নামের মধ্যেই আছে গতি আর উদ্যমের বার্তা। উদ্যোক্তারা বলছেন, নোয়াখালীর প্রাণচাঞ্চল্য আর সাহসী মানসিকতাকেই তুলে ধরতে “এক্সপ্রেস” নামটি বেছে নেওয়া হয়েছে।
দল ঘোষণার পর থেকেই নোয়াখালী ও আশপাশের এলাকায় উৎসবের আমেজ। ফেসবুক, ইউটিউব আর টিকটকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় বানানো মজার পোস্ট আর স্লোগানে ভরে যায় টাইমলাইন। অনেকটা যেন নিজের এলাকার ছেলে মাঠে নামছে—এই অনুভূতিটাই কাজ করছে সমর্থকদের মধ্যে।
স্থানীয় প্রতিভা নিয়ে এগোতে চায় নোয়াখালী
নোয়াখালী এক্সপ্রেসের লক্ষ্য শুধু বড় তারকা নয়, স্থানীয় ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়া। দল গঠনের সময় তারা জানিয়েছে, জেলার তরুণ প্রতিভাদের তুলে ধরাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। এতে করে ভবিষ্যতে জাতীয় দলের জন্যও নতুন মুখ তৈরি হবে—এমন আশাই দেখছেন ক্রিকেট বোদ্ধারা।
একই দলে বাবা ও ছেলে, বিরল এক দৃশ্য
এবারের বিপিএলে দেখা যাবে এক অভিনব দৃশ্য। একই দলে খেলবেন বাবা ও ছেলে। আফগানিস্তানের অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার মোহাম্মদ নবী এবং তার ছেলে হাসান ঈসাখিল খেলবেন নোয়াখালী এক্সপ্রেসের হয়ে।
৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ নবী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পরিচিত নাম। আর তার ছেলে হাসান মাত্র ১৯ বছরের একজন ওপেনিং ব্যাটার। এখনো আফগান জাতীয় দলে অভিষেক হয়নি তার। নোয়াখালী এক্সপ্রেস সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে হাসানকে স্বাগত জানায়, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়।
ভাবুন তো, ডাগআউটে বাবা আর ছেলে একসঙ্গে বসে ম্যাচ দেখছেন, আবার প্রয়োজনে একই একাদশে নামছেন। বিপিএলের ইতিহাসে এমন দৃশ্য আগে দেখা যায়নি। দর্শকদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বাড়তি আকর্ষণ।
নতুন দলের সঙ্গে নতুন বিতর্ক
তবে মাঠের আনন্দের আগে নোয়াখালী এক্সপ্রেসকে পড়তে হয়েছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুশীলনের সময় অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে মাঠ ছেড়ে চলে যান প্রধান কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন ও সিনিয়র সহকারী কোচ তালহা জুবায়ের।
সাংবাদিকদের সামনে সুজনের কণ্ঠে ছিল স্পষ্ট ক্ষোভ। তিনি জানিয়ে দেন, এমন পরিস্থিতিতে বিপিএলের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ তার নেই। কোচদের সিএনজি করে স্টেডিয়াম ছাড়ার দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে।
পরে বিসিবি জানায়, বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝি। জানা যায়, অনুশীলনের জন্য পর্যাপ্ত বল না থাকায় সমস্যা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত দুই কোচই আবার দলে ফিরে আসেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—নতুন দল মানেই কি এমন অব্যবস্থাপনা?
চট্টগ্রাম রয়্যালস এখন বিসিবির কাঁধে
এবারের বিপিএলে আরেক বড় ধাক্কা আসে চট্টগ্রাম রয়্যালসকে ঘিরে। আর্থিক সংকটের কথা বলে শেষ মুহূর্তে দলটির মালিকানা ছেড়ে দেয় ট্রায়াঙ্গল সার্ভিসেস। ফলে টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে বড় চাপে পড়ে বিসিবি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আপাতত চট্টগ্রাম রয়্যালসের পরিচালনার দায়িত্ব নিজেই নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার আহমেদ স্বীকার করেছেন, এমন ঘটনায় বোর্ড প্রবল চাপের মধ্যে পড়েছে।
তিনি বলেন, টুর্নামেন্ট শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে যদি কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি জানায় তারা আর্থিক দায় নিতে পারছে না, তাহলে সেটি সামাল দেওয়া খুব কঠিন হয়ে যায়। এই কথা শুনে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—ফ্র্যাঞ্চাইজি বাছাইয়ের সময় কি যথেষ্ট যাচাই করা হয়েছিল?
খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিয়ে নিয়মের চাপ
বিপিএলের নিয়ম অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই খেলোয়াড়দের অন্তত ২৫ শতাংশ পারিশ্রমিক দিতে হয়। রংপুর রাইডার্স জানিয়েছে, তারা ৫০ শতাংশ পরিশোধ করেছে। রাজশাহী ওয়ারিয়র্স, ঢাকা ক্যাপিটালস ও নোয়াখালী এক্সপ্রেস ২৫ শতাংশ পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এই তথ্য কিছুটা স্বস্তি দিলেও চট্টগ্রাম রয়্যালসের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
ফিক্সিং বিতর্কে আবারও বিপিএল
বিপিএল মানেই ফিক্সিং বিতর্ক—এই ধারণা যেন পিছু ছাড়ছে না। এবারের নিলামের আগেই দুর্নীতি দমন পরামর্শক অ্যালেক্স মার্শালের তত্ত্বাবধানে করা তদন্তে ৯ জন ক্রিকেটারকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মির্জা হুসাইন হায়দারের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে শুধু ক্রিকেটার নয়, কয়েকজন ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্মকর্তা, একজন কোচ ও একজন মিডিয়া ম্যানেজারের নামও উঠে আসে।
জাতীয় দলে খেলা এনামুল হক বিজয় ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের নাম আসায় আলোচনা আরও তীব্র হয়। এই কারণেই তারা এবারের নিলামে ছিলেন না। শুরুতে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ জানালেও পরে বিজয় এই বিষয়ে নীরব থাকেন।
শেষ কথা: মাঠে কী বদলাবে?
সব বিতর্ক, সব ঝামেলা ছাপিয়ে বিপিএলের মূল আকর্ষণ কিন্তু মাঠের ক্রিকেটই। নতুন দল নোয়াখালী এক্সপ্রেস কতটা চমক দেখাতে পারে, বাবা-ছেলে জুটি কতটা কার্যকর হয়, আর বিসিবি কতটা দক্ষতার সঙ্গে সংকট সামাল দেয়—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে মাঠেই।
একজন সাধারণ দর্শকের চোখে বিপিএল মানে সন্ধ্যায় টিভির সামনে বসে রোমাঞ্চকর ম্যাচ দেখা। আশা করা যায়, সব বিতর্ক পেছনে ফেলে এবারের বিপিএল সেই আনন্দটাই ফিরিয়ে দেবে।


