বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখন আলোচনা মানেই মুস্তাফিজুর রহমান। মাঠের বাইরের বিতর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তাপ, বাংলাদেশ-ভারত ইস্যু—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত চাপের মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন এই বাঁহাতি পেসার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এসব কিছু যেন মাঠে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তার কাছ থেকে হারিয়ে যায়। বল হাতে মুস্তাফিজ তখন শুধুই একজন বোলার। নির্ভার, স্থির, ভয়ংকর কার্যকর।
বিপিএলের মঞ্চে রংপুর রাইডার্সের হয়ে আবারও সেটাই প্রমাণ করলেন তিনি। চারপাশে যত কথাই হোক, মুস্তাফিজ যে এখনো “বিন্দাস”, সেটার সাক্ষ্য মিলল ঢাকা ক্যাপিটালসের বিপক্ষে নাটকীয় ম্যাচে।
বিতর্কের কেন্দ্রেও শান্ত মুস্তাফিজ
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঘিরে চলমান আলোচনায় মুস্তাফিজুর রহমান নিজেও অজান্তেই চলে এসেছেন কেন্দ্রবিন্দুতে। আইপিএল থেকে বাদ পড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের ক্ষোভ, নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা—সব মিলিয়ে চাপটা কম ছিল না। অনেকের ধারণা ছিল, এর প্রভাব হয়তো মাঠেও পড়বে।
কিন্তু মুস্তাফিজ বরাবরের মতোই ব্যতিক্রম। বাইরের ঝড় তার ভেতরে ঢুকতে পারে না। মাঠে নামলে তিনি যেন ধ্যানমগ্ন। চোখে কোনো উত্তেজনা নেই, মুখে কোনো বিরক্তি নেই। শুধু রান বাঁচানোর পরিকল্পনা আর ব্যাটসম্যানকে ফাঁদে ফেলার ছক।
ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া স্পেল
রোববার বিপিএলে ঢাকা ক্যাপিটালসের বিপক্ষে রংপুর রাইডার্সের ম্যাচে স্কোরবোর্ডে চোখ রাখলে শেষের সমীকরণটা ঢাকার পক্ষেই ছিল। শেষ ১৮ বলে প্রয়োজন ২৫ রান, হাতে ৭ উইকেট। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এমন অবস্থান সাধারণত ব্যাটিং দলের জন্য স্বস্তির।
কিন্তু সামনে যদি মুস্তাফিজ থাকেন, তখন হিসাবের অঙ্ক বদলে যায়।
১৮তম ওভারে বল হাতে নেন মুস্তাফিজ। ওই ওভারে দেন মাত্র দুই রান। শুধু তাই নয়, শেষ বলে তুলে নেন ঢাকার অন্যতম বিপজ্জনক ব্যাটার শামীম হোসেনের উইকেট। মুহূর্তেই ম্যাচের গতি ঘুরে যায়।
পরের ওভারে আকিফ জাভেদের কাছ থেকে ১৩ রান এলেও শেষ ওভারে প্রয়োজন দাঁড়ায় ১০ রান। উইকেটে তখন অপরাজিত ফিফটি করা মোহাম্মদ মিঠুন ও আগ্রাসী সাব্বির রহমান। দর্শকদের অনেকেই ভাবছিলেন, ম্যাচ বুঝি এবার ঢাকার দিকেই যাচ্ছে।
শেষ ওভারে মুস্তাফিজ মানেই দেয়াল
শেষ ওভারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন মুস্তাফিজ। এই ওভারে বড় শটের জন্য মুখিয়ে ছিলেন মিঠুন-সাব্বির। কিন্তু মুস্তাফিজের নিখুঁত ইয়র্কার, স্লোয়ার আর লাইন-লেন্থের সামনে কেউই স্বচ্ছন্দ হতে পারেননি।
পুরো ওভারে আসে মাত্র চারটি সিঙ্গল। দুটি বল থাকে ডট। বড় শটের কোনো সুযোগই দেননি তিনি। নিজের শেষ দুই ওভারে মুস্তাফিজ দিয়েছেন মাত্র ছয় রান। সেখানেই থামে ঢাকার লড়াই, আর রংপুর তুলে নেয় নাটকীয় ৫ রানের জয়।
অধিনায়কের মুখে হতাশা, শেষে প্রশান্তি
১৯তম ওভারের শেষ বলে আকিফ জাভেদ ছক্কা হজম করার সময় রংপুর অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহানের মুখে বিরক্তি ছিল স্পষ্ট। তখন মনে হচ্ছিল, ম্যাচটা বুঝি হাতছাড়া হতে চলেছে।
কিন্তু শেষ ওভার শেষে দৃশ্যপট বদলে যায়। সোহানের মুখে ফিরে আসে চওড়া হাসি। কারণ, তার হাতে তখন এমন একজন বোলার ছিলেন, যিনি সবচেয়ে চাপের মুহূর্তেও মাথা ঠান্ডা রাখতে জানেন।
“মুস্তাফিজ বিশ্বমানের বোলার”
ম্যাচ শেষে মুস্তাফিজের প্রশংসায় কোনো কার্পণ্য করেননি সোহান। তার কণ্ঠে ছিল গর্ব আর বিশ্বাস।
তিনি বলেন, “মুস্তাফিজ বিশ্বমানের বোলার, এটা সে অনেক দিন ধরেই প্রমাণ করে আসছে। ওকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। সবসময়ই ও মুগ্ধ করে।”
এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে মুস্তাফিজের আসল শক্তি। ধারাবাহিকতা। দিনের পর দিন, ম্যাচের পর ম্যাচ, চাপের মুহূর্তে একই মানের পারফরম্যান্স।
আইপিএল থেকে বাদ পড়া: মানসিক ধাক্কা কি ছিল?
সাম্প্রতিক সময়ে মুস্তাফিজের ক্যারিয়ারের বড় ধাক্কা ছিল আইপিএল থেকে বাদ পড়া। রেকর্ড ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দল পাওয়া এই পেসার প্রথমবারের মতো কলকাতা নাইট রাইডার্সের মতো জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিতে সুযোগ পেয়েছিলেন। ফর্মও ছিল দুর্দান্ত।
এমন অবস্থায় দল থেকে ছিটকে পড়া যে মানসিকভাবে কষ্টের, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
সোহানও সেটা মানছেন। তবে তিনি জানালেন, মুস্তাফিজ নিজের অনুভূতি প্রকাশে বরাবরই সংযত।
“খারাপ লাগা তো থাকতেই পারে। কারণ ও যেটা ডিজার্ভ করে, আগেও আরও বেশি ডিজার্ভ করত। ওই জায়গা থেকে খারাপ লাগা থাকতেই পারে। তবে আমার মনে হয়, এটা ঠিক আছে,” বলেন সোহান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঝড়, মাঠে তার প্রভাব নেই
আইপিএল ইস্যু ঘিরে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেই বিষয়টিকে ক্রিকেটের বাইরের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। কেউ কেউ আবার এটাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিতর্কে রূপ দিচ্ছেন।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। রংপুর শিবির কিংবা মুস্তাফিজ—কাউকেই এসব আলোচনা প্রভাবিত করতে পারেনি।
সোহান স্পষ্ট করেই জানালেন, তিনি নিজেও এসব খুব একটা অনুসরণ করেন না। দলের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে কথা হলেও, সেটার প্রভাব পারফরম্যান্সে পড়েনি।
বাংলাদেশের জন্য সেরাটা দেওয়ার স্বপ্ন
সব বিতর্ক, হতাশা আর আলোচনার মাঝেও মুস্তাফিজের লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশের হয়ে সেরাটা দেওয়া। এই মানসিকতাই তাকে আলাদা করে তোলে।
তিনি চুপচাপ নিজের কাজটা করে যান। উচ্ছ্বাসে ভাসেন না, হতাশায় ভেঙেও পড়েন না। মাঠে নামলে তার চোখে থাকে শুধু উইকেট আর রান বাঁচানোর পরিকল্পনা।
শেষ কথা
চারপাশে যত বিতর্কই থাকুক, মুস্তাফিজুর রহমান মাঠে নামলেই অন্য এক মানুষ। বল হাতে তিনি নির্ভার, নির্ভুল আর ভয়ংকর। আইপিএল, রাজনীতি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—কিছুই তার লাইন-লেন্থ নড়াতে পারে না।
এই কারণেই হয়তো তাকে বলা হয় “কাটার মাস্টার”। আর এই কারণেই, সব কিছুর পরেও, মুস্তাফিজ এখনো বিন্দাস।


