ভারতীয় ক্রিকেট দলে বিরাট কোহলির নাম মানেই সাহস, নেতৃত্ব আর আগ্রাসনের প্রতীক। কিন্তু মাঠে শক্তপোক্ত ও নির্ভীক এই খেলোয়াড়েরও যে চোখে জল আসতে পারে, তা নিজের চোখে দেখেছিলেন যুজবেন্দ্র চাহাল। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে সেই বেদনাদায়ক মুহূর্তের কথা শেয়ার করে ভারতীয় ক্রিকেটভক্তদের আবেগে ভাসিয়ে দিয়েছেন তিনি।
২০১৯ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল: এক অপ্রাপ্তির ইতিহাস
২০১৯ সালের ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারত ছিল অন্যতম ফেভারিট। গ্রুপ পর্বে দুরন্ত পারফর্ম্যান্স দেখিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল বিরাট কোহলির নেতৃত্বাধীন ভারত। তবে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই সেমিফাইনাল ম্যাচে মাত্র ১৮ রানে হেরে বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
চাহাল বলেন, “আমি শেষ ব্যাটার ছিলাম। যখন মাঠ ছেড়ে যাচ্ছিলাম, দেখি বিরাট ভাইয়ের চোখে জল। এরপর দেখি সবাই বাথরুমে ঢুকে কাঁদছে। কোহলিও সেখানে গিয়ে কাঁদছিলেন।”
বিরাট কোহলির কান্না: এক নিঃশব্দ অথচ তীব্র আবেগের বহিঃপ্রকাশ
বিরাট কোহলি, যিনি মাঠে তার আগ্রাসী মানসিকতার জন্য বিখ্যাত, তিনিও সেদিন আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। চাহালের ভাষায়, “ওর চোখে জল দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। পুরো দল যেন একসঙ্গে ভেঙে পড়েছিল। সেই কান্না ছিল হারের কষ্ট, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ না করতে পারার হতাশা।”
চাহালের আত্মবিশ্লেষণ: ‘আমার আরও ভালো বল করা উচিত ছিল’
ওই ম্যাচে যুজবেন্দ্র চাহাল নিজেও সেরা ফর্মে ছিলেন না। তিনি ১০ ওভারে ৬৩ রান দিয়ে কেবল কেন উইলিয়ামসনের উইকেট নিতে পেরেছিলেন।
চাহাল বলেন, “আজও আফসোস হয়। আমি আরও ভালো বল করতে পারতাম। ১০-১৫ রান কম দিলে হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতো। সেটা ছিল মাহি ভাইয়ের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। আমার আরও ঠান্ডা মাথায় খেলা উচিত ছিল।”
সেই ম্যাচের কিছু চাবিকাঠি মুহূর্ত
- ভারতের ব্যাটিং বিপর্যয়: ২৪০ রানের লক্ষ্যে নামতে নেমে মাত্র ৫ রানে ৩ উইকেট হারায় ভারত। রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি ও কেএল রাহুল—তিনজনই ফিরেছিলেন অল্প রানে।
- ধোনি-জাদেজার লড়াই: ধোনি ও রবীন্দ্র জাদেজার জুটি ম্যাচে একটা নতুন আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু ধোনির রানআউটই ছিল শেষ খড়কুটো।
- গুপ্টিলের থ্রো: ধোনিকে রানআউট করা গুপ্টিলের থ্রোটি আজও ক্রিকেট ইতিহাসে এক ‘game-changing moment’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিরাটের কাঁদা কেন ছিল তাৎপর্যপূর্ণ
বিরাট কোহলি সেই সময় ছিলেন বিশ্বের এক নম্বর ব্যাটার। কিন্তু সেমিফাইনালের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি মাত্র ১ রানেই আউট হন। দেশের মাটিতে আইসিসি ট্রফি জয়ের স্বপ্নটা ছিল অনেকটাই তাঁর কাঁধে। সেই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণা শুধু একজন খেলোয়াড়ের নয়, একজন নেতার, একজন সৈনিকের হতাশা ছিল।
ভারতের বিশ্বকাপ যাত্রা ও সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া
ভারতীয় দল যেমন কেঁদেছিল, দেশজুড়ে কোটি কোটি সমর্থকও হতাশায় ভেঙে পড়েছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে দেখা গিয়েছিল হাজারো পোস্ট, যেখানে ভক্তরা খেলোয়াড়দের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু ছিল তীব্র সমালোচনাও।
২০২৩ ওয়ার্ল্ড কাপের প্রতিচ্ছবি: পুরোনো দুঃখের পুনরাবৃত্তি
২০২৩ সালের ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেও টিম ইন্ডিয়া একই কষ্টের সম্মুখীন হয়। দুর্দান্ত পারফর্ম করে ফাইনালে ওঠার পরও অস্ট্রেলিয়ার কাছে হার মানতে হয়। আবারও দেশজুড়ে হতাশা, আবারও ক্রিকেটারদের চোখে জল।
চাহাল সেই সেমিফাইনালের প্রসঙ্গ তুলে আসলে ভারতীয় দলের বারবার ফাইনাল বা সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া ট্র্যাজেডির একটা প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন।
ধোনির শেষ ম্যাচ: এক যুগের অবসান
সেই ম্যাচেই মহেন্দ্র সিং ধোনি তার আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলেন। তার শেষ ইনিংসটি আজও অনেকের মনে গেঁথে আছে। ধোনির রানআউট ছিল যেন ভারতীয় ক্রিকেটের এক যুগের সমাপ্তি।
চাহাল বলেন, “আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল এটা মাহি ভাইয়ের শেষ ম্যাচ। আমি ভালো খেলতে পারলে হয়তো একটা জয় উপহার দিতে পারতাম তাকে।”
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে: শিক্ষা ও প্রেরণা
চাহালের এ স্বীকারোক্তি শুধু আবেগ নয়, একটি দলের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা। এই কান্না কোনো দুর্বলতা নয়, বরং প্রতিজ্ঞা—আবার ঘুরে দাঁড়াবো, আবার লড়বো।
এটাই ক্রিকেটের সৌন্দর্য। যেখানে কান্না যেমন আছে, তেমনি আছে নতুন সূর্যোদয়ের স্বপ্নও।


