বাংলাদেশের ক্রিকেট মানেই একটা নাম বারবার সামনে আসে—শাকিব আল হাসান। মাঠে তাঁর উপস্থিতি যেন পুরো দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দেশের বাইরে আছেন তিনি। রাজনৈতিক পরিবর্তন, আইনি জটিলতা আর বিতর্ক—সব মিলিয়ে তাঁর দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এখন প্রশ্ন একটাই, শাকিব কি আবার জাতীয় দলে ফিরবেন? আর সেই ফেরার পথ কতটা সহজ?
Shakib Al Hasan ২০২৪ সালের মে মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে টি২০ সিরিজ খেলতে দেশ ছাড়েন। সেই সফরের পর আর দেশে ফেরা হয়নি তাঁর। এরই মধ্যে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু শাকিবের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে একাধিক মামলার কারণে।
দেশের মাটিতে এক সময় যাঁর নামে গ্যালারি কাঁপত, সেই ক্রিকেটারই এখন জনরোষ, মামলা আর আইনি লড়াইয়ের মাঝে আটকে আছেন। তবুও ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, দেশে ফেরার আগ্রহ তাঁর প্রবল। জাতীয় দলের জার্সি পরে আবার খেলতে চান তিনি।
Bangladesh Cricket Board বা বিসিবি শুরু থেকেই বলছে, দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে শাকিবকে দরকার। বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের তৃতীয় সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে শাকিবের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এই সিদ্ধান্তের পর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায় বিসিবি। চিঠিতে তারা অনুরোধ জানায়, ঝুলে থাকা মামলাগুলোর দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করা হোক। কারণ জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ ও টুর্নামেন্ট সামনে রেখে অভিজ্ঞ অলরাউন্ডারকে দলে পাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
Ministry of Youth and Sports Bangladesh বিসিবির চিঠি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে। মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শাকিবের দেশে ফেরার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই। তবে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো আইনি প্রক্রিয়াতেই নিষ্পত্তি করতে হবে। বিসিবি ও শাকিবের আইনজীবীদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
সরকারি মহল থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যেখানে সহযোগিতা করা সম্ভব হবে, সেখানে সহায়তা দেওয়া হবে। তবে মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিষয়।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায়। সেই সময় থেকেই শাকিব দেশে ফেরেননি। রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে। জনমনে বিতর্কও তৈরি হয়।
তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্রীড়াঙ্গনে কিছুটা নমনীয় অবস্থান দেখা যাচ্ছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, শাকিব ও মাশরাফির বিষয়ে সরকার ইতিবাচক থাকবে। কিন্তু মামলার নিষ্পত্তি রাষ্ট্রীয় ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হবে।
শাকিবের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, যা তাঁর দেশে ফেরার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথমত, শ্রমিক রুবেল মিয়ার হত্যা মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত রিপোর্ট এখনো জমা হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রতা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দ্বিতীয়ত, শেয়ারবাজারে কারসাজির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, যেখানে শাকিবের নামও রয়েছে।
তৃতীয়ত, চেক জালিয়াতির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। ফলে দেশে ফিরলে তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এই তিনটি মামলাই এখন তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এটা বুঝতে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। ধরো, তুমি একটা ফুটবল দল গড়ছো। সেখানে যদি তোমার সেরা স্ট্রাইকার না থাকে, পুরো পরিকল্পনাই বদলে যায়। ঠিক তেমনই, বাংলাদেশ দলে শাকিব না থাকলে ভারসাম্য নষ্ট হয়।
ব্যাট হাতে নির্ভরযোগ্য, বল হাতে কার্যকর—এমন অলরাউন্ডার খুব কমই পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর অভিজ্ঞতা তরুণদের জন্যও বড় সম্পদ। বড় ম্যাচে চাপ সামলানোর ক্ষমতা তাঁকে আলাদা জায়গায় নিয়ে গেছে।
বিসিবি বারবার বলছে, দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে শাকিবকে প্রয়োজন। শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, ড্রেসিংরুমে তাঁর উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, আইনগত জট খুলবে কবে? কারণ যত দিন মামলা ঝুলে থাকবে, তত দিন অনিশ্চয়তা কাটবে না।
আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। বিসিবি চাইলে সরাসরি কিছু করতে পারে না। তারা কেবল সহযোগিতা চাইতে পারে। শেষ পর্যন্ত আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, সরকারের পক্ষ থেকে দেশে ফেরায় কোনো প্রশাসনিক বাধা নেই বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, আইনি দিক পরিষ্কার হলেই তাঁর ফেরা সম্ভব।
সব কিছু মিলিয়ে বলা যায়, পরিস্থিতি এখন আগের চেয়ে কিছুটা আশাব্যঞ্জক। বিসিবি সক্রিয় হয়েছে। মন্ত্রণালয়ও কাগজপত্র গ্রহণ করেছে। রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলক স্থিতিশীল।
তবে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না। শাকিব নিজেও অপেক্ষা করছেন—দেশে ফিরে আবার সবুজ-লাল জার্সি গায়ে চাপানোর জন্য।
বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন তাকিয়ে আছেন সেই দিনের দিকে, যেদিন আবার মাঠে দেখা যাবে তাঁকে। গ্যালারিতে হয়তো আবার শোনা যাবে পরিচিত স্লোগান। কিন্তু তার আগে আইনের ধাপগুলো পার হওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শেষ পর্যন্ত একটাই কথা—বাংলাদেশের ক্রিকেটে শাকিব আল হাসানের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন সময়ই বলে দেবে, আইনি জট কেটে তিনি আবার দেশের হয়ে খেলতে পারবেন কি না।



