বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবার কি ফিরতে চলেছেন শাকিব আল হাসান? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে এমন প্রশ্ন এখন ভক্তদের মুখে মুখে। দেশের ক্রিকেট বোর্ড ইতিমধ্যে তাঁকে দ্রুত দেশে ফেরানোর উদ্যোগ জোরদার করেছে। জানা গেছে, শাকিবের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলার নথি নতুন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর তাঁর জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা নতুন করে জোরালো হচ্ছে।
ক্রিকেটভিত্তিক আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট Cricbuzz জানিয়েছে, বোর্ড ও সরকারের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে পাকিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন ওয়ানডে সিরিজেই হয়তো দেখা যেতে পারে এই তারকা অলরাউন্ডারকে।
কেন দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে শাকিব?
২০২৪ সালে কানপুরে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট খেলার পর থেকেই জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে নামেননি শাকিব। এর মধ্যেই তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন—দেশের মাটিতে একটি সিরিজ খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানাতে চান। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলের পর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ বদলে যায়। শাকিব আগে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য ছিলেন। সেই সূত্রে তাঁর বিরুদ্ধে খুনের মামলাসহ একাধিক মামলা হয়। দেশে ফিরলে গ্রেফতারের আশঙ্কা থাকায় তিনি আর বাংলাদেশে ফেরেননি।
সরকার বদলের পর বদলে গেল চিত্র
বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পরই বোর্ডের ভেতরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। প্রায় আট ঘণ্টার এক বৈঠকে শাকিবকে ফেরানোর জোর দাবি ওঠে। এর মধ্যেই দেশের নেতৃত্বে আসেন নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার পরিবর্তনের পর শাকিব ইস্যুতে গতি আরও বেড়েছে।
নতুন প্রশাসন ক্রিকেটের স্বার্থে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের পথে নিতে আগ্রহী বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে। বোর্ডও চায়, আইনি জটিলতা মিটিয়ে দ্রুত তাঁকে জাতীয় দলে ফেরানো হোক।
মামলার নিষ্পত্তিতে উদ্যোগ
সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, শাকিব ও সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি মোর্তাজার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, আইনি বাধা দূর হলে তাঁদের ক্রিকেটে ফেরার পথ খুলে দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের প্রয়োজন। তাই আইনি প্রক্রিয়া মেনেই দ্রুত সমাধান খোঁজা হচ্ছে। এই মন্তব্যের পরই শাকিবের আইনি দল সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সব মামলার বিস্তারিত নথি প্রস্তুত করে।
বোর্ডে জমা পড়ল আইনি নথি
শাকিবের আইনজীবীরা প্রস্তুত করা নথি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-এর কাছে পাঠিয়েছেন। বোর্ড সেগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দিয়েছে।
বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “শাকিবের মামলার সব নথি আমরা সরকারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি।” এই পদক্ষেপকে অনেকেই দেখছেন শাকিবের ফেরার পথে বড় অগ্রগতি হিসেবে।
সতীর্থদের চোখেও আশার আলো
শুধু বোর্ড নয়, দলের ভেতরেও শাকিবকে ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা প্রবল। ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মেহেদি হাসান মিরাজ খোলাখুলিভাবে বলেছেন, শাকিবের সঙ্গে আবার খেলতে পারলে দল অনেক শক্তিশালী হবে।
মিরাজের কথায়, “শাকিব ভাইয়ের সঙ্গে অনেক বছর খেলেছি। উনি যদি পাকিস্তান সিরিজের আগে ফেরেন, তাহলে আমরা খুব খুশি হব।” তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট—দলের ভেতরে শাকিবকে ঘিরে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।
কেন এত জরুরি শাকিবের ফেরা?
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন শাকিব। ব্যাট ও বল—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর প্রভাব অসাধারণ। মাঠে তাঁর উপস্থিতি মানেই বাড়তি আত্মবিশ্বাস।
সম্প্রতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর দেশের ক্রিকেটে দর্শক আগ্রহ কমে গেছে। এমনকি সাম্প্রতিক কিছু ঘরোয়া টুর্নামেন্টেও গ্যালারি ফাঁকা দেখা গেছে। এই পরিস্থিতিতে বোর্ড মনে করছে, শাকিবের প্রত্যাবর্তন আবার দর্শকদের উজ্জীবিত করতে পারে।
অনেকটা এমন—দলে যদি অভিজ্ঞ বড় ভাই ফিরে আসে, ছোটরা যেমন নতুন উদ্যম পায়, তেমনি পুরো দলও চাঙা হয়ে ওঠে।
সামনে বড় লক্ষ্য: বিশ্বকাপ পরিকল্পনা
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় লক্ষ্য ওয়ানডে বিশ্বকাপ। সেই মঞ্চে শক্তিশালী দল গড়তে অভিজ্ঞ অলরাউন্ডারদের প্রয়োজন হবে। বোর্ড সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে, শাকিবকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও সাজানো হতে পারে।
বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে থাকতে হবে বাংলাদেশকে। এই কঠিন লক্ষ্য পূরণে শাকিব বড় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করছে ক্রিকেট মহল।
সবকিছু এখন সরকারের সিদ্ধান্তে
সব মিলিয়ে শাকিবের ফেরার পথ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি পরিষ্কার। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আইনি প্রক্রিয়া ও সরকারের অবস্থানের ওপর।
যদি মামলার জট দ্রুত কাটে, তাহলে খুব শিগগিরই আবার লাল-সবুজ জার্সিতে দেখা যেতে পারে দেশের এই তারকা অলরাউন্ডারকে। ভক্তরা এখন শুধু অপেক্ষায়—আরেকবার কি মাঠ কাঁপাবেন শাকিব?
সময়ের উত্তরই বলে দেবে।



