বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গন এমনিতেই বেশ কিছু ইস্যুতে উত্তপ্ত। মোস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল থেকে বাদ পড়া, ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশের আপত্তি—এসব নিয়ে আলোচনা এখনও থামেনি। এরই মধ্যে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের একটি মন্তব্য। সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে তাঁর করা বক্তব্যে ক্ষোভ আর হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে ক্রিকেট মহলে। এবার সেই মন্তব্যের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন জাতীয় দলের টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম সাবেক টাইগার অধিনায়ক তামিম ইকবালকে ‘ভারতীয় দালাল’ বলে আখ্যা দেন। বিসিবির মতো একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের কাছ থেকে এমন মন্তব্য আসায় অবাক হয়েছেন অনেকেই। ক্রিকেটপ্রেমীদের পাশাপাশি স্থানীয় ক্রিকেটারদের মধ্যেও বিষয়টি তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
ক্রিকেটারদের অধিকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংগঠন কোয়াব এক বিবৃতিতে এই মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, একজন ক্রিকেটারের সম্মান ক্ষুণ্ন করে এমন বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, বিশেষ করে যখন তা আসে বোর্ডের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে।
এই বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে এবার প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান জানালেন জাতীয় দলের টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিপিএলের ম্যাচে চট্টগ্রাম রয়্যালসের বিপক্ষে রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের ২ উইকেটের হারের পর সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
শান্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, বিসিবি পরিচালকের এমন মন্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক। তাঁর মতে, তামিম ইকবাল শুধু একজন সাবেক অধিনায়ক নন, তিনি বাংলাদেশের অন্যতম সফল ক্রিকেটার। যাঁকে দেখে অনেক তরুণ ক্রিকেটার বড় হয়েছেন, স্বপ্ন দেখেছেন।
শান্ত বলেন, একজন ক্রিকেটার সফল হোক বা না হোক, দিনশেষে সে সম্মানটুকু আশা করেই মাঠে নামে। তামিম ইকবালের মতো একজন ক্রিকেটার, যিনি দেশের হয়ে এত কিছু করেছেন, তাঁকে নিয়ে এমন মন্তব্য করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, আমরা যাঁকে দেখে ক্রিকেট শিখেছি, যাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেক সাফল্য পেয়েছে, তাঁর সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলা সত্যিই কষ্টের। এটা শুধু একজন খেলোয়াড়ের জন্য নয়, পুরো ক্রিকেট সংস্কৃতির জন্যই হতাশাজনক।
শান্তর বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে একটি জায়গা—বিসিবির ভূমিকা। তাঁর মতে, ক্রিকেট বোর্ড হচ্ছে ক্রিকেটারদের অভিভাবক। সেই অভিভাবকের কাছ থেকেই যদি এমন মন্তব্য আসে, তাহলে সেটি মানসিকভাবে আরও বেশি আঘাত করে।
শান্ত বলেন, ঘরের মানুষদের কাছ থেকে আমরা আশা করি তারা আমাদের আগলে রাখবে, সমর্থন দেবে। বাইরের কেউ সমালোচনা করলে সেটা একরকম, কিন্তু নিজের ঘরের মানুষের কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য পাওয়া সত্যিই কষ্টের।
নিজের অনুভূতি বোঝাতে গিয়ে শান্ত একটি সহজ কিন্তু শক্ত উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, বাবা-মা চাইলে ঘরের ভেতরে সন্তানকে বকাবকি করতে পারেন। কিন্তু কেউই চায় না, সেই বকুনি সবার সামনে হোক।
তামিম ইকবালের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমনই। যদি কোনো ভুল থেকেও থাকে, তাহলে সেটা ঘরের ভেতরে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু প্রকাশ্যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন মন্তব্য করা একজন অভিভাবকের কাছ থেকে মোটেও প্রত্যাশিত নয়।
এই ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বিসিবির দায়িত্ববোধ নিয়ে। একজন পরিচালক যখন প্রকাশ্যে একজন সাবেক অধিনায়ককে নিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করেন, তখন তা পুরো বোর্ডের ভাবমূর্তিতেই প্রভাব ফেলে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, বোর্ডের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে সংযম থাকা জরুরি। কারণ তাঁদের কথা শুধু ব্যক্তিগত মত নয়, বরং সেটি প্রতিষ্ঠানকে প্রতিনিধিত্ব করে। শান্তর মতো বর্তমান ক্রিকেটারদের প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিচ্ছে, এই ধরনের মন্তব্য মাঠের ভেতরের পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তামিম ইকবাল বাংলাদেশের ক্রিকেটে শুধু একটি নাম নন, তিনি একটি অধ্যায়। লাল-সবুজের জার্সিতে তাঁর অবদান, নেতৃত্ব আর ধারাবাহিকতা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো ক্রিকেট ইতিহাসকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
অনেক ক্রিকেটপ্রেমী বলছেন, মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অসম্মানজনক ভাষা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
নাজমুল হোসেন শান্তর বক্তব্য আসলে অনেক ক্রিকেটারের মনের কথাই তুলে ধরেছে। ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, এটি সম্মান, শৃঙ্খলা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গা। বোর্ড কর্মকর্তা থেকে শুরু করে খেলোয়াড়—সবার কাছ থেকেই দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত।
তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালকের মন্তব্য সেই জায়গাটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শান্তর স্পষ্ট অবস্থান দেখিয়ে দিচ্ছে, বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেটাররা আর এসব বিষয়ে নীরব থাকতে চান না। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ক্রিকেটে এমন বিতর্ক কমে আসবে, আর সম্মানই থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।


