বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লড়াকু পারফরম্যান্সের জন্য প্রশংসা কুড়ালেও উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সেই ধারার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। শেষ পর্যন্ত সিডনিতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ৫–০ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজয় মেনে নিতে হয় বাংলাদেশকে।
এই হারের ফলে টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অবস্থান আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। আগের ম্যাচে চীনের বিপক্ষে হারলেও বাংলাদেশের মেয়েরা লড়াইয়ের মনোভাব দেখিয়েছিল। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে সেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি দলটি।
ম্যাচের শুরু থেকেই উত্তর কোরিয়া আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। দ্রুত পাসিং, পরিকল্পিত আক্রমণ এবং ধারাবাহিক প্রেসিংয়ের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের রক্ষণভাগে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে।
এই ম্যাচে উত্তর কোরিয়ার হয়ে জোড়া গোল করে জয়ের নায়ক হন কিম কিয়ং-ইয়ং। এছাড়া দলের হয়ে একটি করে গোল করেন মিয়ং ইউ-ঝং, চায়ে উন-ইয়ং এবং কিম হায়ে-ইয়ং। তাদের ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে বাংলাদেশের রক্ষণভাগ প্রায় অসহায় হয়ে পড়ে।
প্রথমার্ধ থেকেই গোলের খাতা খুলে উত্তর কোরিয়া ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে আরও দ্রুত আক্রমণ চালিয়ে তারা গোলসংখ্যা বাড়াতে থাকে। বাংলাদেশের মেয়েরা মাঝেমধ্যে বল দখল পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি।
যদিও স্কোরলাইনে বড় ব্যবধান দেখা যায়, তবুও বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তারের পারফরম্যান্স ছিল প্রশংসনীয়। তিনি পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে অসাধারণ কিছু সেভ করেন, যা না হলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।
ম্যাচজুড়ে মিলি অন্তত পাঁচটি নিশ্চিত গোল বাঁচান। উত্তর কোরিয়ার আক্রমণভাগ বারবার শট নিলেও তার দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও সাহসী ডাইভিং সেভ বাংলাদেশের জন্য বড় স্বস্তি হয়ে দাঁড়ায়।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, মিলি আক্তারের এই পারফরম্যান্সই ছিল বাংলাদেশের জন্য ম্যাচের অন্যতম ইতিবাচক দিক। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি দলকে আরও বড় বিপর্যয় থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।
ম্যাচের পরিসংখ্যান দেখলেই দুই দলের শক্তির পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুরো ম্যাচে উত্তর কোরিয়া মোট ৩১টি শট নেয়, যার মধ্যে ১১টি ছিল সরাসরি লক্ষ্যে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ খুব কম সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে। আক্রমণভাগে কার্যকর কোনো আক্রমণ গড়ে তুলতে না পারায় দলটি প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়।
বল দখলের দিক থেকেও উত্তর কোরিয়া ছিল অনেক এগিয়ে। তাদের দখলে ছিল প্রায় ৬৫.৩ শতাংশ বল, যেখানে বাংলাদেশের দখলে ছিল মাত্র ৩৪.৭ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় ম্যাচে কোন দল কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে।
ম্যাচ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগে।
ঋতুপর্ণা ও মারিয়াসহ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা বল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। প্রতিপক্ষের চাপের কারণে তারা দ্রুত বল হারিয়ে ফেলেন। ফলে বাংলাদেশের পক্ষে ধারাবাহিক আক্রমণ তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
মাঝমাঠে বল দখল রাখতে না পারায় রক্ষণভাগের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়। ফলে ডিফেন্ডারদের বারবার বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপই একের পর এক গোল হজমের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের ডিফেন্ডাররা ম্যাচজুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্লক ও ক্লিয়ারেন্স করলেও উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক আক্রমণের সামনে তা যথেষ্ট ছিল না।
উত্তর কোরিয়ার খেলোয়াড়রা দ্রুত গতির পাসিং ও উইং ব্যবহার করে বারবার বাংলাদেশের ডিফেন্স ভেঙে ফেলে। এতে গোলরক্ষক মিলিকে প্রায় একাই বহু পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে।
রক্ষণভাগের এই চাপ দীর্ঘ সময় ধরে সামলানো সম্ভব হয়নি। ফলে ম্যাচের শেষদিকে গোলের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
টুর্নামেন্টে এটি বাংলাদেশের টানা দ্বিতীয় পরাজয়। প্রথম ম্যাচে চীনের কাছে ২–০ গোলে হারার পর এবার উত্তর কোরিয়ার কাছে ৫–০ গোলের বড় হার দলটির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।
এই দুই ম্যাচের ফলাফলের কারণে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের টিকে থাকার সম্ভাবনা কঠিন হয়ে উঠেছে। তবে দলটি এখনো শেষ ম্যাচে ভালো ফল করে সম্মানজনকভাবে টুর্নামেন্ট শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের মেয়েরা উজবেকিস্তানের মুখোমুখি হবে। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৯ মার্চ পার্থে।
এই ম্যাচে জয়ের মাধ্যমে অন্তত মান বাঁচাতে চায় বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। কোচিং স্টাফ এবং খেলোয়াড়রা নিজেদের ভুলত্রুটি বিশ্লেষণ করে উন্নতির চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।
ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা, শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের মেয়েরা নতুন উদ্যমে মাঠে নামবে এবং একটি ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করবে।
যদিও বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য কঠিন, তবুও ফুটবল সবসময়ই সম্ভাবনার খেলা। অতীতে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল বহুবার প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
দলের তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য এই আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলো বড় অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজ করবে। ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী দল হিসেবে গড়ে উঠতে এসব ম্যাচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সমর্থকদের আশা, শেষ ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্যের সেরা ফুটবল খেলবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা এবং নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল।



